Mufti Masud
আমার গাছে অপরাজিতা ফুটেছে অপরাজিতা নিয়ে একটু স্মৃতিচারণ না করলে মনটা ভরছে না। সেটি ২০০২ সালের কথা, আমি তখন মালিবাগ মাদ্রাসার ছাত্র। মালিবাগ বাজার থেকে খিলগাঁওয়ের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে তার ডান পাশে ছিল রেললাইন, এবং রেললাইনের পরেই বস্তি যেখানে বাস্তুহারা মানুষদের বসবাস ছিল। ধনীদের বসবাস ছিল এর উল্টো সাইডে, অর্থাৎ রাস্তার বাঁ দিকটায়। বাঁ দিকের রাস্তার ধারের আইল্যান্ড ধরে বিকেলবেলা হাঁটতে বের হতাম। মাদ্রাসার জেলখানার সাথে অন্যান্য জেলখানার পার্থক্য শুধু এটুকুই, মাদ্রাসার জেলখানা থেকে বিকেলবেলা অর্থাৎ আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজের আগ পর্যন্ত সময়টায় বাহিরে বেরোনোর সুযোগ পাওয়া যেত। অবশ্য সময়টা খুবই সংক্ষিপ্ত – আধ ঘন্টা থেকে এক ঘন্টার মতো। সূর্যাস্তের সময়ে যে অসাধারণ দৃশ্যের তৈরি হয় চারিদিকে, অসাধারণ সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় দূর দিগন্তে সেটি দেখার সৌভাগ্য মাদ্রাসার ছাত্রদের কখনোই হয় না। কারণ সূর্যোদয়ের আগেই তাদেরকে জেলখানায় তথা মাদ্রাসায় ফিরে যেতে হয়। সূর্যাস্তের সাথে সাথে মাগরিবের আজান হয় এবং এরপর নামাজ। একদিন আসরের নামাজের পর সাথে আরো দু’জন ক্লাসমেট ছিল, হাঁটতে বেরিয়েছি। মালিবাগ বাজার ধরে বাঁ দিকটার ফুটপাত ধরে খিলগাঁওয়ের দিকে হাঁটছিলাম। এখন যেখানে খিদমাহ হাসপাতাল হয়েছে তার কাছাকাছি কোন একটা জায়গায় ছোট্ট একটা নার্সারি ছিল; খুবই ছোট জায়গা, খুবই সংকীর্ণ। আমার চোখ আটকে গেল একটি নীল রঙের ফুল দেখে। সাথে সঙ্গী দু’জনকে থামিয়ে দিয়ে আমি সে ফুলের কাছে চলে গেলাম। দীর্ঘ সময় দেখতে লাগলাম। নার্সারির মালিককে জিজ্ঞেস করলাম এই ফুল গাছের নাম কি? তিনি জানালেন – অপরাজিতা। বন্ধু দুজন কিছুটা বিরক্ত হলেও আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আরও কিছুক্ষণ ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর মাদ্রাসা তথা জেলখানায় ফিরে গেলাম। দিনরাত আমার মাথায় ঘুরতে থাকল অপরাজিতা ফুল, অপরাজিতা ফুল। কয়েকদিন পর যখন বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ছুটি পেলাম তখন সেই নার্সারিতে গিয়ে অপরাজিতা ফুলের গাছ কিনে নিলাম। অবশ্য সেই গাছটি খুব সম্ভবত ছিল না, অন্য একটি গাছ কিনেছিলাম যদ্দূর মনে পড়ে। বাসায় নিয়ে একটি টবের মধ্যে গাছটি লাগিয়ে দিলাম। পরবর্তীতে আমাদের বাসার ছাদের একটা সাইডে ইট-বালু-সিমেন্ট এর প্লাস্টার করে বিশাল একটি জায়গা বানিয়ে সেখানে মাটি ভরাট করে তাতে অপরাজিতা গাছটি লাগিয়ে দিলাম। অনেক অনেক বড় হয়ে গেছিল, অনেক অনেক ফুল হয়েছিল। আজও সেই গাছের কথা আমার মনে পড়ে। ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অপরাজিতা ফুলের প্রতি আমার সেই প্রেম আর কমাতে পারিনি। আজও অপরাজিতাকে সেই পরিমাণ ভালোবাসি যেমন ভালবেসে ফেলেছিলাম প্রথম দর্শনে, ২০০২ সালের সেই বিকেলে।

মুফতি মাসুদ একজন প্রাক্তন ইমাম এবং ইসলামী পণ্ডিত, যিনি এখন মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করা মুফতি মাসুদ নারী অধিকার, এলজিবিটিকিউ অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিবেদিত। তিনি তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে ক্ষমতাশালী করতে চান।