আবদুল্লাহ আল মাসুদ
একজন হেফাজত নেতার মৃত্যু
নারায়ণগঞ্জের হেফাজতে ইসলাম নেতা মাওলানা ইকবাল হোসেনের মৃত্যু হয়েছে পুলিশি হেফাজতে। মাত্র ৫৫ বছর বয়স ছিল তাঁর। যদি তাঁকে রিমান্ডে নির্যাতন করা হয়, যদি তিনি সুচিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন তবে এটি অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। এই হেফাজত নেতার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে। আজকে যদি ফরহাদ মজহার কিংবা ব্যারিস্টার তুহিন মালিক পুলিশি হেফাজতে থাকতেন এবং তাদের মৃত্যু হতো তাহলে আমরা যারা মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের কথা বলি তারা কি নিন্দা করতাম না? অবশ্যই করতাম। কিন্তু একজন মসজিদের ইমাম বা হেফাজতে ইসলামের নেতা হওয়ার কারণে আমাদের পক্ষ থেকে মাওলানা ইকবাল হোসেনের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তেমন কোন প্রতিবাদ হয়নি। কিন্তু নিন্দা-প্রতিবাদ করেছে কে? করেছে ফরহাদ মজহার। করেছে আরো এরকম অনেক ‘বামায়াতে ইসলামীর’ লোকজন। আমি ফরহাদ মজহারের ভন্ডামি দেখে অবাক হইনা, কারণ সেই পিকিংপন্থী মাওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে এখনকার বেইজিংপন্থী ফরহাদ মজহার যে একই চরিত্রের হবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি কেবল অবাক হই সেইসব মানুষ দেখে যারা কেবলমাত্র পোশাক আর পেশা দিয়ে মানুষকে বিচার করে। দাড়ি-টুপিবিহীন ফরহাদ মজহার কিংবা দাড়ি-টুপিহীন আসিফ নজরুলকে গ্রেপ্তার করলে বা নির্যাতন করলে যাদের মানবতার টনক নড়ে কিন্তু দাড়ি-টুপিওয়ালা হুজুরদের নির্যাতন করলে যাদের মানবতার টনক নড়ে না তাঁরা কি ধর্মান্ধদের চেয়ে খুব বেশি আলাদা? আমাকে আপনারা বলুন তো, হেফাজতে ইসলাম নেতা মামুনুল হক ভট্টাচার্যের সাথে ফরহাদ মজহারের চিন্তাগত কোন পার্থক্য আছে কি? মাওলানা ইকবাল হোসেনের চিন্তার সাথে অধ্যাপক আসিফ নজরুলের ভাবনা-চিন্তার কোন পার্থক্য আছে কি? তেমন পার্থক্য নেই। লক্ষীপুরের তাহের কিংবা নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমান এদের চিন্তার সাথে মাওলানাদের চিন্তার কি খুব বেশি পার্থক্য? যদি আসিফ নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়, নির্যাতন করা হয় এবং সেজন্য তার মৃত্যু হয় তবে এমন কোন নাস্তিক পাওয়া যাবে না যে এর নিন্দা করবে না। কিন্তু যখন জেলখানায় রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মাওলানা ইকবাল হোসেনের মৃত্যু হল তখন কি শাহবাগে একটা জমায়েত হতে পারল না? রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হতে পারলাম না? কিশোর এবং কাজলের জন্য আমরা যতটা সোচ্চার থেকেছি মাওলানা ইকবাল হোসেনের জন্য কি ততটা সোচ্চার হয়েছি? মাওলানা বলে কি তাঁর প্রাণের কোন দাম নেই? মাদ্রাসায় পড়েছেন বলে কি তিনি ফেলনা? দাড়ি-টুপি পরিধান করে ইসলামিক জিহাদ করেছেন বলে কি তাঁর মানবাধিকার থাকতে নেই? কিন্তু দাড়ি-টুপি ছাড়া জিহাদী মাহমুদুর রহমান, দাড়ি-টুপি ছাড়া জিহাদী তুহিন মালিকদের মানবাধিকার থাকতে হয়, তাইতো? আমি এখানে কেবল মানবতার কথাই বলতে এসেছি। মানবতার কথাই বলে যেতে চাই। আর যদি সত্যিই আমরা মানবতার কথা বলি তাহলে আমাদের মানবতা যেন সিলেক্টিভ হয়ে না যায়, ঠিক ধর্মবিশ্বাসীদের মতই। যদি মামুনুল হক ভট্টাচার্যকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় আমি তবে তারও নিন্দা করি, কিন্তু একই সাথে মামুনুল হক ভট্টাচার্যের সন্ত্রাস, অরাজকতা, পরকীয়া, ভন্ডামি, আর্থিক দুর্নীতি এসব কিছুর বিরুদ্ধেও আমি কথা বলি। যে মাহমুদুল হাসান গুনভী এবং ওয়াসেক বিল্লাহ নোমানী বাংলাদেশের নাস্তিক, হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছেন, তাদের হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের মাথা কেটে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন তাদেরও মানবাধিকার আছে এটা আমি মনে করি। আবার ভেবে বসবেন না যে, তাদের মানবাধিকার আছে মানে আমি তাদের অপরাধীদেরও কারামুক্তি চাইছি! তাঁরা মানে না যে, আমাদের প্রাণের, মতামতের, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য আছে কিন্তু আমরা তাদের প্রাণ, মতামত ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য আছে তা মেনে নিই। আর এখানেই পার্থক্য মানবাধিকার ও ইসলামাধিকারের মধ্যে।