Mufti Masud
(সবটুকুই মুহাম্মদ বই থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হলো)

মুহাম্মদের আইনের বেশিরভাগ অংশই ছিল প্রতিশোধের সাম্যতা সম্পর্কিত, চোখের বদলে চোখ এবং দাঁতের বদলে দাঁত – আরব রীতিনীতির পুনঃস্থাপন। এই বিষয়গুলি সহিংসতা বা দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের অপরাধের সাথে জড়িত। লোকেদের রক্তের বদলে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিশোধ বা নিষ্পত্তি ছিল একমাত্র বিকল্প উপায়। মুহাম্মদের বেশিরভাগ মীমাংসার ঘটনায় জীবনহানি বা অঙ্গহানির ক্ষতি নিষ্পত্তি জড়িত ছিল এবং তিনি এ জাতীয় বিষয়ে মোকদ্দমার জন্য কোরআনের বহু আয়াত সৃষ্টি করেছিলেন। ইচ্ছাকৃত সহিংসতার ক্ষেত্রে তিনি ক্ষমাকে বিকল্প হিসেবে উত্সাহিত করেন, কিন্তু প্রতিশোধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতেন না। যেমন এক নারীর হত্যার ঘটনাই, যেখানে এক নারী অন্য নারীকে বেলন দিয়ে মারতে মারতে মেরে ফেলেছিল। যে নারী মারা গিয়েছিল সে গর্ভবতী ছিল এবং তার সাথে তার ভ্রূণও মারা যায়। মুহাম্মদ ভ্রূণের মৃত্যুর জন্য একটি উটকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন এবং প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সেই নারীকে ভুক্তভোগীর পরিবারের হাতে তুলে দেন। পরিবারটি সম্ভবত তাকেও বেলন দিয়ে হত্যা করে।
দুর্ঘটনাজনিত হত্যাকাণ্ড বা বিপর্যয় সমাধান করা হতো রক্তের বদলার অর্থ প্রদানের মাধ্যমে। মুহাম্মদ এক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন যে, নগরবাসী কাউকে হত্যা করলে মূল্য দিতে হবে চারশো স্বর্ণের মুদ্রা বা তার সমমানের রূপা। বেদুইনরা মূল্য পরিশোধ করবে গবাদি পশুদের দান করে – দু’শো উট বা দুই হাজার ভেড়া বা ছাগল। কারো পুরো নাক কাটা পড়লে একশো উটের জরিমানা ছিল, তবে যদি নাকের ডগা কাটা যেত তবে অর্ধেক দিতে হতো। হাত বা পা হারালে পঞ্চাশটি উট ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
কম আঘাতের জন্য কম পরিমাণের ক্ষতিপূরণ। আঙুল বা দাঁতের বেলায় প্রত্যেকটি আঙুলের জন্য দশটি উট এবং প্রতিটি দাঁতের জন্য পাঁচটি করে উট ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল।
মুহাম্মদ তাঁর সামনে উপস্থিত কিছু মামলা আদালতের বাইরে হাসতে হাসতে সমাধান করতেন, যেমন লড়াইয়ের সময় কাউকে কামড় দেয়ার সময় সামনের দাঁত হারানো এক ব্যক্তি বদলা হিসেবে দাঁতের বদলে দাঁত বা পাঁচটি উট দাবি করে। মুহাম্মদ বললেন, “আপনি কি তার মাংস খাওয়ার চেষ্টা করছেন?” তিনি আবেদন খারিজ করে দেন এবং বিবাদীকে দায়মুক্তি দেন (২৩)।
ছবিঃ “পাথর ছুঁড়ে মার!” ব্যভিচারীদের জন্য এটাই মুহাম্মদের হুকুম ছিল। ইয়াছরিব পৌঁছানোর এক বছরের মধ্যেই তিনি ব্যভিচারে ধরা পড়া দুজন ইহুদিকে পাথর ছুঁড়ে মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা স্পষ্টতই ধর্মান্তরিত ছিল, যারা মুহাম্মদের বিধিবিধান মেনে চলা আরব গোত্রসমূহের অন্যতম একটি গোত্রের অন্তর্ভূক্ত। রাব্বিগণ ক্ষমা করে দেয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু কোন ফল হয়নি। তাদেরকে মুহাম্মদের মসজিদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং জনতা তাদের পাথর মেরে হত্যা করেছিল। কথিত আছে যে, পুরুষটি তার নিজের শরীর দিয়ে নারীকে ঢেকে পাথর থেকে রক্ষা করেছিল।
একটি অপরাধ মুহাম্মদ কখনোই ক্ষমা করতেন না, তা হলো একজন মুমিনের হাতে আরেকজন মুমিনের হত্যা। উহুদের যুদ্ধের পরে তিনি এর নজির দেখিয়েছিলেন, যখন তিনি এক দশক আগে এক বিশ্বাসীর পিতাকে হত্যা করার বদলা স্বরূপ যুদ্ধের সময়কে কাজে লাগিয়ে আরেকজন বিশ্বাসীকে হত্যা করা এক ব্যক্তির শিরোশ্ছেদ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সামরিক অভিযানগুলোর একটির সময়ে আরেকজন বিশ্বাসী-বিশ্বাসীর হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল যা এরূপ :
মুহাল্লিম (Muhallim) নামের একজনকে অন্যদের সাথে মিশনে পাঠানো হয়েছিল। পথিমধ্যে তার সাথে এমন একজনের দেখা হলো যার সাথে মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করার আগে থেকেই তার ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল। যদিও সাক্ষাতের সময়ে লোকটি একজন মুমিনের মতোই মুহাল্লিমকে সালাম দেয়, কিন্তু মুহাল্লিম তাকে একটি তীর দিয়ে হত্যা করে এবং তার উট এবং সাথে থাকা জিনিসপত্র চুরি করে। খুনিকে মুহাম্মদের সামনে টেনে আনা হলো। মুহাম্মদ তখন একটি বাবলা গাছের ছায়ায় বসে ছিলেন। মরুভূমি তখনই আদালত চত্বরে পরিণত হলো এবং ক্ষতিগ্রস্থ গোত্রের (নিহত ব্যক্তির গোত্রের) অসংখ্য যাযাবররা শালিসটি দেখার জন্য মুহাম্মদের সামনের সারিতে পা ভাঁজ করে বসে রইল। সাক্ষীরা উঠে দাঁড়িয়ে যা জানত তা তাকে বললেন। মুহাল্লিমের গোত্রের সদস্যরা তার গুণাবলী বর্ণনা করে তার পক্ষ হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল; আর মৃত ব্যক্তির গোত্রের সদস্যরা মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানাল। মুহাল্লিমের গোত্রের একজন হুমকি দিল যে, তিনি পঞ্চাশজন লোককে জোগাড় করে নিয়ে আসবেন যারা শপথ করে বলবে ঐ মৃত ব্যক্তি সত্যিকারের বিশ্বাসী (মুমিন) ছিল না, সে কখনও নামাজও পড়েনি — এককথায়, সে ছিল মোনাফেক। এক্ষেত্রে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না, কারণ কাফেরদের হত্যা করার জন্য বিশ্বাসীদের হত্যা করা যায় না, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। মুহাম্মদ মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এই বলে যে, তারা এক্ষুনি পঞ্চাশটি উট, আর বাড়ি ফিরে যাওরার পর আরও পঞ্চাশটি উট পাবে। এটি ছিল একজন কাফেরকে হত্যা করার শাস্তি। তবে ভুক্তভোগীর পরিবার রক্তের বদলে রক্ত দাবি করেছিল। অভিযুক্তকে মুহাম্মদের সামনে দাঁড়ানোর আহবান না করা পর্যন্ত তিনি তার পেছনেই বসে ছিল। সে ছিল বয়সে তরুণ, লম্বা এবং তার চোখে পানি ছিল। সে তার অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইল। মুহাম্মদ আকাশের দিকে হাত তুললেন, আকাশ থেকে নির্দেশনা চলে এলো এবং উচ্চস্বরে সবাইকে মুহাম্মদ শুনিয়ে বললেন : “আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না!”
মুহাম্মদ তিনবার বাক্যটির পুনরাবৃত্তি করলেন। এটি ছিল তার মৃত্যুদণ্ড, যার কোন পুনর্বিবেচনার সুযোগ ছিল না। দোষী লোকটিকে একটি পাহাড়ের শৃঙ্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো এবং পাথরের স্তূপের নিচে তাকে দাফন করা হলো (২৪)।
মুহাম্মদ ভিন্নমত বরদাশত করতেন না। কেবলমাত্র ঠাট্টা, তামাশা বা সমালোচনা করার জন্যও তিনি মানুষকে হত্যা করতেন, তবে তার নিকট আত্মসমর্পণ করলে বা ক্ষমা চাইলে ভিন্ন কথা। বদর যুদ্ধের পরে কবিদের হত্যা করার মধ্য দিয়ে তিনি হত্যালীলা শুরু করেন। এমনকি তার অনুসারীরা যখন তাদের নিজস্ব উদ্যোগে মুহাম্মদের সমালোচকদের লোকদের হত্যা করে ফেলত, তখন তিনি তা অনুমোদনও করতেন। ইতিহাসে মুহাম্মদের একজন অন্ধ সাহাবির (অনুসারী) একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে নিন্দা করার দোষে তার ইহুদি শয্যাসঙ্গিনীকে খুন করে ফেলে। সেই নারী প্রায়শই মুহম্মদের সমালোচনা করত, কিন্তু অন্ধ বর তাকে থামার নির্দেশ দেয়া সত্বেও এক রাতে সে মুহাম্মদের নামে যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছিল। এর ফলে অন্ধ সাহাবি তার স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এই কথা চারদিকে ছড়িয়ে পরে এবং পরদিন একটি মসজিদের সমাবেশে মুহাম্মদ অপরাধীকে উঠে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করতে বলেন। অন্ধ লোকটি দাঁড়িয়ে বলল, “আল্লাহর রাসূল! সে আপনাকে গালাগালি করত এবং আপনাকে অস্বীকার করত। আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু সে থামেনি। আমি তাকে ধমক দিয়েছি, কিন্তু সে অভ্যাসটি ছাড়েনি। তার গর্ভ থেকে মুক্তোর মতো আমার দুটি ছেলে পেয়েছি এবং সে আমার সঙ্গিনী ছিল। গতরাতে সে আপনাকে গালি দিতে থাকে এবং অস্বীকার করতে শুরু করে। তাই আমি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে দিই এবং মৃত্যু নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ছুরিটি চেপে ধরে রাখি”। মুহাম্মদ এই ব্যাখ্যাটা গ্রহণ করলেন। তিনি সমাবেশে বললেন, “সাক্ষ্য দাও, তার রক্তের জন্য কোনও প্রতিশোধ গ্রহণযোগ্য নয়”। এভাবেই তিনি এক নির্মম হত্যাকে বৈধতা দিলেন এবং এই বললেন যে, “আমার সমালোচনাকারীদের হত্যা করা বৈধ” (২৫, ২৬)।
আরবের অগ্রবর্তী ধর্ম হিসেবে মৃত্যুর আগে মুহাম্মদ জীবনের প্রায় সকল বিষয়ে বিধিবিধান তৈরি করে যান, যেমন : জায়গা জমির ব্যবসা, ঋণ দেয়া, উত্তরাধিকার, শেয়ার ক্রপিং, খেজুর, খেজুর গাছ এবং প্রাণীদের কেনাবেচা এমন সব বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে থাকেন। কীভাবে মলত্যাগ করবে, কীভাবে ধোবে, কীভাবে পোশাক পরবে, কীভাবে মানুষকে সম্বোধন করবে, কী খাবে এবং কী খাবে না তিনি সে সমস্ত বিষয়ে তার নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। বিবাহ, জন্ম এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমস্ত কিছুই তার বিধিবদ্ধ নিয়মের স্বাক্ষর বহন করে। মিউজিক, গান গাওয়া এবং নাচকে অলস কার্যকলাপ হিসেবে তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন, কেননা এসব কিছু লোককে আল্লাহর পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তিনি প্রার্থনার অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা এবং পশু কুরবাণীর বিষয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন, এ সমস্তই ছিল মুমিন মুমিনের বিশ্বাসের পরিচায়ক। কোরআনের আয়াত এবং তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের রীতিনীতি তথা সুন্নাহ, এ দুটির সংমিশ্রণই মুহাম্মদের আইন হয়ে উঠল। মূলত, তিনি নিজে প্রতিটি পরিস্থিতিতে কী করেছিলেন, সেটি হতে পারে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নিছক তার আচরণের উদাহরণ, তাইই সুন্নাহ। এই সংমিশ্রণটিকে তখন ডাকা হতো এবং আজও ডাকা হয় শরিয়া বা ‘পথের নির্দেশক’ বলে। বিশ্বাস করা হয়, মুহাম্মদের আয়াতসমূহ আর তার দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণ তথা সুন্নাহর দেখানো পথে চললে নিশ্চিত বেহেশত লাভ হবে।
খিঁচুনির সময়কার সেই কাব্যিক আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য মুহাম্মদ একজন লিপিকার নিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন অর্ধশিক্ষিত, সম্ভবত মৃগীরোগের সাথে সম্পর্কিত dyslexia (লিখতে ও পড়তে না পারার মতো এক ধরনের স্নায়বিক অক্ষমতা) এর কারণে তার ভালোমত লেখাপড়া শেখা হয়ে ওঠেনি। তবে তার অনেক অনুসারীই শিক্ষিত ছিল, আর মুহাম্মদ তাদের সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। গভীর ঘুমের ঘোর থেকে বিছানায় জেগে উঠে বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রমণের সময় মুহাম্মদ যখন ওহী লাভ করতেন, চিৎকার করে বলে উঠতেন, “এটি লিখে নাও, লিখে নাও”। এরপরেই বিশ্বস্ততার সাথে তার কথাগুলি লুফে নিয়ে লিপিকার তার দোয়াত-কলম হাতে নিয়ে কাব্যিক ঢংয়ে আয়াতগুলো লিখে নিত। মক্কায় তার তড়িঘড়ি করে নিয়ে আসা ছোট ছোট ছান্দসিক আয়াতগুলোর তুলনায় ইয়াছরিবে নাজিল করা আয়াতগুলি অনেক বড়, ঝাঁজালো ও আইন সংক্রান্ত ছিল। যেমন এই আয়াতে শপথ ভঙ্গ করার বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
“আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হচ্ছে দশজন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান করা, কিংবা একজন দাসকে মুক্ত করা। কিন্তু যে সামর্থ্য রাখে না সে তিনদিন রোজা রাখতে পারে। এটা তোমাদের কসমের কাফফারা, যদি তোমরা কসম কর; আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।” (২৭)।
তার এক সাহাবী, এই আয়াতগুলো প্রস্ততির নাড়িনক্ষত্র টের পেয়ে ধর্মত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন। তার পুরো নাম আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে সারহ — সংক্ষেপে আবদুল্লাহ সারহ। তিনি মক্কা থেকে এসেছিলেন এবং প্রথমদিকের ধর্মান্তরিত ছিলেন যিনি মুহাম্মদের সাথে ইয়াছরিবে পালিয়ে গিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন, পড়তে এবং লিখতে জানতেন, তিনি মুহাম্মদের অন্যতম প্রিয় সহায়ক হয়ে ওঠেছিলেন। তার দক্ষতা চিঠি লেখায়, সমঝোতা স্মারক তৈরিতে এমনকি চুক্তির প্রতিলিপি তৈরিতেও কাজে লাগত। কোরআন রচনার সময় মুহাম্মদ তাকে তার কাছে রাখতেন। বলা হয়ে থাকে যে, মুহাম্মদের আকস্মিক আয়াত বলে ওঠার সময়ে, আবদুল্লাহ মাঝে মাঝে শব্দের মাঝে কিছুটা পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিতেন। এমনই একদা মুহাম্মদ যখন “এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী” বলে একটি আয়াত শেষ করেছিলেন তখন আবদুল্লাহ সম্ভবত কাব্যগুণের কারণে বা কবিতার ছন্দ মেলাতে সেই স্থলে “বুদ্ধিদীপ্ত এবং জ্ঞানবান” লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ তার পরামর্শতে আপত্তি করেননি। একপর্যায়ে আবদুল্লাহর কাছে এমন মনে হতো যেন একজন নিছক লেখকের কথা মুহাম্মদ আল্লাহর বাণী বলে দাবি করা করছে। মুহাম্মদের নিবিড় সান্নিধ্যে থাকার কারণে তিনি মুহাম্মদের “ওহী” নাযিলের মুহুর্তগুলি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হতেন এবং এটি তাকে স্মরণ করিয়ে দিত, কিভাবে তার পরিচিত মক্কাবাসী কবিগণ তাদের কাব্য-প্রতিভার সর্বোত্তম প্রকাশের জন্য লড়াই করে যেত। তিনি উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি, এসেছে মুহাম্মদের কাছ থেকেই। তার বিশ্বাস ভেঙে যায়, তিনি পালিয়ে মক্কায় ফিরে যান এবং মুহাম্মদের সাথে আল্লাহ কথা বলে মুহাম্মদের এই দাবিকে অবান্তর বলে মক্কাবাসীদের সামনে হাসতে হাসতেই তিনি খারিজ করে দেন। তিনি বলেন “মুহাম্মাদ জানতেন না তিনি কি বলছেন! আসলে, আমি যা চাইতাম তার পক্ষ থেকে সেটাই লিখতাম। যা আমি লিখেছি, তা আমার কাছে নাজিল হওয়ার মতো, যেভাবে মুহাম্মদের কাছে নাজিল হতো (২৮)।
মুহাম্মদ আবদুল্লাহকে অনন্তকাল আগুনে পুড়িয়ে ফেলার চেয়েও বেশি কিছু করেছিলেন। এর বছরখানেক পরে যখন তিনি মক্কা বিজয় করেছিলেন, তখন তিনি তার সাথে একটি তালিকা রাখতেন যেখানে এমন লোকদের নাম ছিল যাদেরকে তিনি দেখামাত্রই হত্যা করতে চেয়েছিলেন। সেই তালিকার শীর্ষে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহ।