Mufti Masud
আমি এক ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের একেকটি কওমি মাদ্রাসাকে একেকটি মিনি পাকিস্তান বলেছি। এটি এমনিতেই বলিনি, যারা কওমি মাদ্রাসায় পড়ে এবং কওমি সংশ্লিষ্ট তাদের সবার মাথার মধ্যেই পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের মক্কা-মদিনা সদাসর্বদা ঘুরপাক খায়। কওমি মাদ্রাসার এই পাকিস্তান-প্রেম এবং পাকিস্তানের উর্দু ভাষার প্রেম এটি এমন এক রূঢ় বাস্তবতা যাকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। এটি যেমন কওমি মাদ্রাসার আদর্শ ও ঐতিহ্যের সাথে একীভূত হয়ে গেছে একইভাবে একথাও সত্য যে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে অশিক্ষিত শ্রমিক এরা সবাই কওমি মাদ্রাসাকে মিনি পাকিস্তান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং রেখে দিতে বদ্ধপরিকর। খোঁজ নিলে দেখবেন, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয় বুয়েটের অধিকাংশ শিক্ষকই কওমি মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসার পাকিস্তানপ্রীতি টিকিয়ে রাখার ফরমাবরদার। বুয়েটের এসব শিক্ষকদের দেখলে এরা বুয়েটের শিক্ষক নাকি হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক আপনি পার্থক্য করতে পারবেন না! এমন নয় যে, তাঁরা কওমি মাদ্রাসার ভেতরকার খবর জানেনা। তাঁরা সবই জানে। এমন নয় যে তারা মাদরাসার ধর্ষণের কাহিনী জানেনা, তাঁরা সবই জানে। সাধারণ একজন কৃষক কিংবা শ্রমিক কওমি মাদ্রাসার ভেতরকার খবর নাও জানতে পারে, কিন্তু ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা? তাঁরা সবই জানে!
মনে পড়ে, মাদ্রাসায় আমাদের ক্যাসেটে উর্দু ওয়াজ শোনানো হতো। উর্দু ভাষার গজল (মাদ্রাসার কারাগারে ইসলামিক সংগীতকে গজল বলা হয়) শেখানো হতো। অধিকাংশই ছিল জিহাদী গজল। এছাড়া আরও কিছু গজল শিখতাম মোহাম্মদ এবং আল্লাহর প্রশংসাসূচক। মোহাম্মদের প্রশংসাসূচক গজলকে বলা হয় নাতে রাসূল, আর আল্লাহর প্রশংসাসূচক গজলকে বলা হয় হামদে বারি তাআলা। সপ্তাহে একদিন মাদ্রাসার কারাগার বা মিনি পাকিস্তান থেকে অল্প সময়ের জন্য ছুটি পেতাম। বাসায় এসে দেখতাম, আমার বাবা ক্যাসেটে উর্দু ভাষার ওয়াজ, উর্দু গজল বাজাচ্ছেন। সে সময়ে পাকিস্তানের হুজুরদের ওয়াজ ছিল আমার বাবার খুব পছন্দের। বাংলাদেশের সব হুজুরদের কাছে পাকিস্তানি হুজুর এবং ভারতীয় উর্দুভাষী হুজুরদের ওয়াজ খুব জনপ্রিয় ছিল। সেটা অবশ্য এখনও আছে – এখনো বাংলাদেশের সব জিহাদী হুজুরদের নেতৃত্ব দেয় পাকিস্তানি হুজুররা এবং ভারতীয় উর্দুভাষী হুজুররা। মনে আছে, একটি ক্যাসেটের নাম ছিল মাউত কা মানজার (মৃত্যুর দৃশ্য)। সেটি এক পাকিস্তানি হুজুরের ওয়াজ ছিল যেটা আমার বাবা প্রায়ই বাজাতেন। মাঝেমাঝে তিনি আমাকে ওয়াজের বিভিন্ন অংশ তরজমা করে শোনাতেন। সেসব ওয়াজ শুনে সেই শৈশবেই জিহাদ করে শহীদ হয়ে বেহেশতে যেতে আমার মন উতলা হতো। পাকিস্তানি একজন সংগীতশিল্পী যার নাম ফায়াস উদ্দিন গোবার্দী, তাঁর ইসলামিক সংগীত আমার বাবা খুব পছন্দ করতেন। ফায়াস উদ্দিন গোবার্দী মৃত্যুর কথা, পরকালের কথা, দোযখের শাস্তির কথা খুব করুণ সুরে গাইত।
আসলে আমি বাংলাদেশের প্রত্যেক হুজুর এবং হুজুর পরিবারের কথাই বলছি। আসলে এসব কিছুই সমাজের অধিকাংশ লোক জানে, কিন্তু আক্ষেপ এই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে এই কথাগুলো আলোচনায় আনা হয় না! মাদ্রাসায় কেন এখনো উর্দুভাষা পড়ানো হয় বা পড়ানো বাধ্যতামূলক সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। কওমি মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত পালন করা হয় না, জাতীয় দিবস পালন করা হয় না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে আলোচনা হয় না সে প্রশ্নটা ইদানিং কিছু কিছু মানুষ করলেও আগে কখনো কেউ এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি।
যে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করেছে আক্ষেপের বিষয় এই যে, সেই মুক্তিযোদ্ধারাই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মিনি পাকিস্তান তথা কওমি মাদ্রাসা টিকিয়ে রেখেছিল। সেই মুক্তিযোদ্ধারাই বাংলাদেশের একদল শিশুকে এই মিনি পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি করে তাদেরকে দেশদ্রোহী ও জঙ্গি বানিয়ে ফেলেছিল। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের বানানো বা টিকিয়ে রাখা মিনি পাকিস্তানের ফসলই হচ্ছে আজকের হেফাজতে ইসলামের জঙ্গি হুজুররা। সেই মুক্তিযোদ্ধারাই এখনো পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে কওমি কারাগার বা পাকিস্তানি কারাগার বানাচ্ছে এবং সেখানে সাহায্য-সহযোগিতা করছে। যে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল সেই ভারতের হুজুররা এবং ভারতীয় চীনপন্থী রাজনীতিবিদেরাই বাংলাদেশে মিনি পাকিস্তান তৈরি করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, এমনকি পাকিস্তানি হুজুরদের চেয়েও বেশি!
আমার বুঝে আসে না, এত কষ্ট করে দেশটা স্বাধীন করে তাহলে কি লাভ হলো? এতগুলো মানুষ দেশের জন্য কেন অকাতরে জীবন দিল? এতগুলো মানুষ কেন পঙ্গু হলো? খন্ড খন্ড পাকিস্তানের চেয়ে পুরো বাংলাদেশটাই যদি পাকিস্তান হয়ে থাকত সেটাই কি ভালো ছিল না? বাংলাদেশ কি আসলেই কি স্বাধীন হয়েছে নাকি বিশ্বে আরেকটি নতুন ‘মুসলিম দেশের’ অভ্যুদয় হয়েছে? আমরা কি আসলেই স্বাধীনতা পেয়েছি নাকি আরেকটি ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের’ নাগরিক হয়েছি? মাদ্রাসার বর্বরতা এর কুশিক্ষা আগে যা ছিল তারচে কমেনি, বরং বেড়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কয়েক হাজার কওমি কারাগার বা মিনি পাকিস্তান ছিল। তৎকালীন শাসকেরা মিনি পাকিস্তানগুলি বন্ধ করেনি, কারণ, ধর্মীয় অনুভূতি! আর এখন? এখন তো লক্ষ লক্ষ মিনি পাকিস্তানে বাংলাদেশ ভরে গেছে! ডঃ মঞ্জুরে খোদার একটি পোস্ট থেকে জানতে পারলাম, বাংলাদেশের প্রত্যেক তিনজন পড়ুয়ার একজন কওমি মাদ্রাসার। বাংলাদেশের প্রত্যেক পড়ুয়ার একজন যদি মিনি পাকিস্তানের বাসিন্দা হয় বা পাকিস্তানপন্থী হয়, আর বাকি দু’জন যদি এই মিনি পাকিস্তানের সহযোগী হয় তাহলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যেতে আর কতটুকু বাকি আছে?
