Mufti Masud
বিশ্ববরেণ্য নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ইসলাম-প্রীতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে আবার ইসলাম-প্রীতির তকমা পাওয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম নিয়ে কোন কথাই বলেন না। বরং তারা ইসলাম নিয়ে কেউ সমালোচনা করলেই তাকে বলবে, সমস্যা আসলে ওটা না, সমস্যা হচ্ছে অমুক দেশ, অমুক ইজম। আমি অবশ্য এসকল বিশিষ্টজনদের বিশ্ববরেণ্য নাগরিক না বলে বিশ্ববরেণ্য আঁতেল বলতেই বেশি পছন্দ করি।
বিশ্ববরেণ্য আঁতেলদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল পছন্দ করে। আসলে আঁতেল এবং তেল খুব কাছাকাছি একটা বিষয়। বিশ্ববরেণ্য আঁতেলগণ পশ্চিমা দেশের সমালোচনা করেই সে দেশ থেকে পুরস্কার পায়, এবং পুরস্কার পাওয়ার পরেও সে দেশেরই সমালোচনা করে।
আমি একথা বলছি না যে পশ্চিমা দেশের সমালোচনা করা যাবেনা, সমালোচনা করার মত অনেক উপাদানই তাদের মধ্যে আছে। কিন্তু সমালোচনা যদি হয় একরোখা এবং কোন এক দিক থেকে মানুষের দৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা, তবে তাকে আমি সমীহ করতে পারিনা। নারীকে হিজাবে বন্দি করার চেষ্টারত খাঁটি মুসলিম তালেবানদের হাতে গুলি খেয়ে মরতে বসেছিল মালালা। পশ্চিমারা তাকে চিকিৎসা দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, নোবেল পুরস্কার দিয়ে খ্যাতি এনে দিয়েছে। আজ মালালা হয়েছে খাঁটি মুসলিম তালেবানের সবচেয়ে পছন্দের পোশাক হিজাবের সোল এজেন্ট। পাদপ্রদীপের নিচে থাকা অরুন্ধতী রায়কে ব্রিটেন বুকার পুরস্কার দিয়ে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে। তাই বলে কি অরুন্ধতী রায় বৃটেনের সমালোচনা করতে পারবে না? হ্যাঁ, পারবে। চীন, পাকিস্তান, আমেরিকা, সৌদি আরব ও ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করতে পারবে না? কবি এখানেই নিরব। কারণ কবি মনে করেন, অরুন্ধতী রায় চীন, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করতে পারবেন না।
বিশ্ববরেণ্য নাগরিকরা কিভাবে ইসলাম-প্রেমিক হয় সে বিষয়ে আমার কাছে স্পেসিফিক তথ্য আছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত আরবি মাসিক পত্রিকা ‘আল বায়ান’ (مجلة البيان) আমি নিয়মিত পড়তাম। মিশর থেকে প্রতিমাসে আমার কাছে সে পত্রিকার একটি করে ফ্রি কপি আসত। বাংলাদেশে আমার ঘরে একটি বইয়ের লাইব্রেরি ছিল যেখানে কয়েক হাজার বই ছিল। তার মধ্যে আল বায়ান পত্রিকার ষাট থেকে সত্তরটা কপিও আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে থেকে প্রাণ নিয়ে পালানোর সময়ে আমি সে বইগুলো আনতে পারিনি।
২০১৬ সালের কোন একদিন ঢাকায় আমার মসজিদের রুমে বসে আল বায়ানের পুরনো কপিগুলো পড়ছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি সংখ্যায়। সম্ভবত কোনো এক অক্টোবর মাসের সংখ্যা সেটি। সেখানে বিপুল পরিমাণ বুদ্ধি সাপ্লাই করা আছে আন্তর্জাতিক ইসলামিক গবেষকদের পক্ষ থেকে। সাপ্লাইকৃত বুদ্ধির মধ্যে রয়েছে বিশিষ্ট নাগরিকদেরকে ইসলামের সৌন্দর্য বোঝানো, ব্রিটেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে ইসলামের পজিটিভ দিকসমূহ তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া, আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্টদেরকে বিভিন্ন ইসলামি অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা, ইসলামের সৌন্দর্য নিয়ে ছোট-বড় পুস্তক প্রকাশ করে সেগুলো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। সবচেয়ে মজার একটি পরামর্শ ছিল, তা হচ্ছে পশ্চিমা দেশের যে সকল বিখ্যাত ব্যক্তিরা ইসলামের সমালোচনা করে তাদেরকে ইফতার মাহফিল ও মুসলিমদের উৎসবে সম্মানিত অতিথি করা। ইসলামের সৌন্দর্য বোঝানোর জন্য তাদেরকে যথাসাধ্য হাদিয়া-তোহফা (উপঢৌকন) দেয়া। তাদেরকে এমনভাবে সম্মান প্রদর্শন করা যেন তারা কোরআনের জিহাদের আয়াত সমূহ জানলেও সেটা ভুলে যায়!
সেখানে এমন পরামর্শ ছিল যে, মুসলিমদের বাকপটু দায়ী বা প্রচারকগণ তাদের শীর্ষ ইসলামিক বুদ্ধিজীবীদের সাথে গোপন বৈঠকে মিলিত হবেন এবং তাদের কাছে কর্মপরিকল্পনা পেশ করবেন, প্রতিদিন, সপ্তাহে ও মাসে তারা কতজন বিখ্যাত মানুষের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়েছেন। ইসলামের সৌন্দর্য বোঝানোর পর বিখ্যাত ব্যক্তিটি কি মন্তব্য করেছেন, কি প্রশ্ন করেছেন, ইসলামের কোন বিষয়ের উপর আপত্তি করেছেন সেগুলোর নোট করে শীর্ষ ইসলামিক বুদ্ধিজীবীদের কাছে জমা দিতে হবে। নোট দেখে সেসবের উত্তর তৈরি করা হয়। এবার তৈরি করা উত্তর নিয়ে এবং সাথে কিছু বই এবং হাদিয়া-তোহফা নিয়ে যেতে হবে সংশ্লিষ্ট বিখ্যাত ব্যক্তির কাছে। পত্রিকাটিতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে এবং খুব নির্লজ্জ ভাবেই – উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে সারা বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরতে হবে, এবং দুর্দশার কারণ হিসেবে অমুসলিমদেরকে চিহ্নিত করা যাবে না কোনোভাবেই। বরং উদ্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী ব্যক্তি পুঁজিবাদী ভাবধারার হলে তার কাছে সমাজতন্ত্রকে ভিলেন হিসেবে দেখিয়ে আর ব্যক্তি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার হলে তার কাছে পুঁজিবাদকে ভিলেন হিসেবে দেখিয়ে সহানুভূতি আদায় করতে হবে।
আর ব্যক্তি যদি না পুঁজিবাদী, না সমাজতান্ত্রিক হয় তবে তার কাছে তুলে ধরতে হবে যে, ইসলামও আপনার মতোই চিন্তা করে। ইসলাম না পুঁজিবাদী, না সমাজতান্ত্রিক। ব্যক্তি যদি একনায়ক রাজনীতিবিদ হন তবে তাকে বলতে হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একনায়কতন্ত্র সমর্থন করতেন, আর ব্যক্তি গণতন্ত্রের সমর্থক হলে তাকে বলতে হবে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ছয়জনের কমিটি করেছিলেন, যেটাকে তৎকালীন যুগে গণতন্ত্রের সূচনা বা অগ্রগতি বলা যেতে পারে।
আজ মনে পড়ল আল বায়ান পত্রিকার সেই সংখ্যাটির কথা। আমি গুগল সার্চ করে আরবি ভাষায় প্রকাশিত আল বায়ান পত্রিকায় ঢোকার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আমি নোয়াম চমস্কি, অরুন্ধতী রায়, মালালা, সলিমুল্লাহ, ফরহাদ মজহারের মতো খ্যাতিসম্পন্ন মানুষদের কলমের একরৈখিকতার কারণ খুঁজে পেয়েছি। আমি মালালার হিজাব-প্রীতির কারণও খুঁজে পেয়েছি।
আপনি পেয়েছেন কি?
