Mufti Masud
ওনারা সিদ্ধান্ত নিলেন, মুসলিমরা তাদের শরিয়া আইন, কুসংস্কার, চার বিবি আর বহু বহু সন্তান নিয়ে থাকুক। মুসলিমরা মাদ্রাসা নিয়ে থাকুক, দাড়িটুপি নিয়ে থাকুক; মুসলিমরা থাকুক কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা নিয়ে। মুসলিমরা ধর্মান্ধতা নিয়েই পড়ে থাকল। ওনাদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ব্রাহ্মণ্যবাদও এখানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ওনারা মনে করেছেন নিম্নবর্ণের লোকেরা (মুসলিমরা) কেন পড়াশোনা করবে? ওরা অশিক্ষিত থাকুক। ওরা দাস হয়ে থাকুক। মুসলিম নারী যখন তাঁর বরের কাছে মার খায়, মুসলিম নারী যখন তাঁর বরের কাছ থেকে মুখের কথায় তালাকের মাধ্যমে বিদায় হয়, মুসলিম নারী যখন তার বরের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্ত্রী মেনে নিতে বাধ্য হয়, মুসলিম নারী যখন অত্যাচারের শিকার হয়ে কান্নাকাটি করে তখন ওনারা বলেন – “ওটা মুসলিমদের নিজস্ব ব্যাপার, ওখানে নাক গলিয়ে লাভ নেই।” মুসলিমদের ধর্মান্ধতা দেখে, উগ্রতা দেখে ওনাদের সন্তানরা এবার “কাউন্টার-মুসলিম” হওয়ার চেষ্টা করল। তাঁরা ইসলামের আদলে হিন্দু শরিয়া আইন তৈরি করার চেষ্টা করল। তাঁরা খেলাফত রাষ্ট্রের আদলে রামরাজ্য কায়েমের স্বপ্ন দেখল। তাঁরা আল্লাহু আকবার এর আদলে “জয় শ্রীরাম” বানালো। তাঁরা এক উম্মাহ ধারণার স্টাইলে এক হিন্দু জাতির ধারণা তৈরি করল। তাঁরা মহররমের তরবারি মিছিলের অনুকরণে রামনবমীর ত্রিশূল মিছিল চালু করল। তাঁরা শূকরের মাংসের হারাম হওয়ার অনুসরণ করে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করল। এখন কেবল একটাই বাকি আছে, আর সেটি হচ্ছে – মুসলিমদের অনুকরণে ওদেরও সুন্নতে খতনা চালু করা। রাজা রামমোহন রায় এবং ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে সংস্কার আন্দোলন চালু করেছিলেন সেটি যদি ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকত, সেটি যদি কেবল হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুসলিমদের মধ্যেও চালু করা যেত, যদি “মুসলিম পুরুষদের সুযোগ দাও ওদের বউদের ওরা পেটাবে” এই ধারণা রাজনীতি কর্তৃক প্রমোট করা না হতো তাহলে হয়তো আমরা অন্য এক ভারতবর্ষ দেখতাম। আপনি অন্য একটা লোককে যদি সমর্থন করেন সে তাঁর সন্তানকে পেটাবে তাহলে কেন আপনি নিশ্চিত থাকেন যে, নিজের সন্তানকে পেটানোর পর সে আপনার সন্তানকেও পেটাতে আসবে না? এবং আপনি যে লোকটাকে তার নিজের সন্তানকে পেটানোর বিষয়টাকে সমর্থন করেছিলেন সেই লোকটাই যখন আপনার সন্তানকে পিটুনি দেবে তখন কোন নৈতিক অবস্থান থেকে আপনি প্রতিবাদ করবেন? আমার আফসোস হয় সেই সমস্ত মানুষদের দেখে যাদের মনের মধ্যে মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা! আমার আফসোস হয় সেই সমস্ত মানুষদের দেখে যারা মনে করে এক্স-মুসলিম হলে বুঝি হিন্দুত্ববাদের সমর্থন করতে হয়। আমার আফসোস হয় সে সমস্ত মানুষদের দেখে যারা মুসলিমদের ঘৃণা করতে গিয়ে, উগ্র জাতীয়তাবাদের সমর্থন করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের অজান্তে কুড়াল মারছে নিজেদেরই পায়ে। এবং এর ফলশ্রুতিতে কি হচ্ছে? রামরাজ্য কায়েমিদের উগ্রতার জবাবে আরেক উগ্রতা তৈরি হচ্ছে – Intellectual ferocity। রামরাজ্য কায়েমিদের উগ্রতার জবাবে যে উগ্রতা তৈরি হচ্ছে সেটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক উগ্রতা। একদল বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়েছেন এবং একদল রাজনীতিবিদ তৈরি হয়েছেন যারা ওদের দমন করার জন্য জিহাদিদের ব্যবহার করছে। এই বুদ্ধিজীবীরা ওদের রামরাজ্যের স্বপ্নকে বানচাল করার জন্য জিহাদিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সাহায্য দিচ্ছে। এভাবেই দুটি পক্ষ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে – একদল রামরাজ্যের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, আরেকদল ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ঘৃণার জবাবে মুসলিমদের ইসলামিক ঘৃণাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। কখনো কখনো মনে হয় – ওরা ওরাই তো – ব্রাহ্মণে ব্রাহ্মণে লড়াই, মুসলিমদের এখানে কি? না, আমি পরক্ষণেই ভাবি, মুসলিমদের এখানে অনেক কিছু। মুসলিমদের বাঁচাতে হবে। মুসলিমদের বাঁচাতে হবে ইসলাম থেকে, যাতে মুসলিমরা ওদের দ্বারা ব্যবহৃত না হয়। আবার একইসাথে মুসলিমদের বাঁচাতে হবে ওদের হাত থেকে, যাতে ওরা মুসলিমদেরকে ইসলামের কারাগারে বন্দি করে রাখতে না পারে। আপনি যদি ভারতের মুসলিমদের ওদের হাত থেকে রক্ষা করেন তবে অবশ্যই মুসলিমরা ইসলাম ত্যাগ করে মানুষ হবে। আবার যদি মুসলিমদের ইসলাম থেকে রক্ষা করেন তাহলে অবশ্যই মুসলিমরা ওদের রাজনৈতিক তুরুপের তাস আর হবেনা। আমরা যদি মুসলিমদের ইসলাম থেকে বাঁচাতে পারি, আমরা যদি মুসলিমদের ওদের হাতে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারি তাহলে হতে পারে ওদের যে প্রজন্ম এখন ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াবে না। হয়তোবা তাঁরা থেমে যাবে। আমরা যদি হুজুরদের (মোল্লাদের) বাঁচাতে পারি মডারেট মুসলিমদের থেকে তবে জঙ্গিবাদ থমকে দাঁড়াবে। ওনারাই (মডারেট) যে নিজেরা ভদ্রতা আর প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে কিন্তু নির্মাণ করে মাদ্রাসা যেখানে শিক্ষাদান জিহাদের, যেখানে মানুষকে বাধ্য করা হয় জঙ্গিবাদী হতে! (প্রিয় লেখক তসলিমা নাসরিনের একটি কমেন্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমার এই অনুলিখন)