শুরু করা যাক একটি গল্প দিয়ে। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় বেড়াতে গেলেন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই। চীনের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। অনুষ্ঠানে গানও পরিবেশিত হয়েছে। সবার শেষ গান গাইলেন কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আর গানটি ছিল “আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই আল্লা মেঘ দে”। গান শেষ হতেই সকলে দেখল বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সেদিন চৌ এন লাই বলেছিলেন: “হয়তো অনেক কিছুই আমি মনে রাখতে পারব না, কিন্তু যা আমি আজীবন মনে রাখব তা হলো- একজন শিল্পী কীভাবে গান গেয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারেন।” (তথ্যসূত্র: সা রে গা মা বেঙ্গল) ইসলাম ধর্মে, খুব বেশি খরা ও অনাবৃষ্টি হলে তখন আল্লাহর কাছে বিশেষ ধরনের নামায পড়তে হয় যাকে বলা হয় সালাতুল ইস্তিসকা। বাংলাদেশের যশোরের এক পীর সাহেবের গল্প বলছি শুনুন। একবার বাংলাদেশে প্রচন্ড খরা দেখা দিল। বৃষ্টি নেই, জমির ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে, গরমে মানুষের জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। লোকজন গিয়ে পীর সাহেবকে বলল, হুজুর আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। পীর সাহেব একদিন ইস্তিসকার নামাযের আয়োজন করলেন। নামাজ হলো, নামাজের নামাজের পর প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি চাওয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামল। পীর সাহেবের কেরামতি বেড়ে গেল। লোকজন বলাবলি করল, পীর সাহেবের সাথে আল্লাহর ‘হট কানেকশন’ আছে। চলুন একটু হাদিসের গল্প শুনে আসি: আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশুগুলো মারা যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট (বৃষ্টির জন্য) দু’আ করুন। তখন তিনি দু’আ করলেন। ফলে এক জুমু’আ থেকে অপর জুমু’আ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হতে থাকল। এরপর এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘরবাড়ী বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলো মারা যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! পাহাড়ের উপর, টিলার উপর, উপত্যকা এলাকায় এবং বনাঞ্চলে বর্ষণ করুন। ফলে মদিনা থেকে মেঘ এরূপভাবে কেটে গেল যেমন কাপড় ফেড়ে ফাঁক হয়ে যায়। প্রতিটি বিশ্বাসে মুসলিম মনে করে, সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা তথা নবী মোহাম্মদের প্রার্থনার কারণে। আমার শৈশবের ঘটনা বলছি শুনুন: ঢাকার হাজারীবাগে একবার বৃষ্টির জন্য নামাযের আয়োজন হয়েছিল। আমি সেখানে আমার বাবার সাথে গিয়েছিলাম। হাজারীবাগ বড় মসজিদের ইমাম নামাজ ও প্রার্থনার নেতৃত্ব দিলেন। সেদিন মানুষের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহর ভান্ডার থেকে বৃষ্টি পাঠানো হল না। যদি বৃষ্টি নামত তাহলে ওই ইমাম সাহেবের পীর সাহেব হয়ে যেতে আর সময় লাগত না। প্রমাণ হয়ে যেত ইমাম সাহেবের সাথে আল্লাহর হট কানেকশন আছে। আমি নিজেও একসময় মসজিদের ইমাম ছিলাম। সে সময়ে ইমামতি করতে করতে এক পর্যায়ে ইসলামের প্রতি বিতৃষ্ণা হয়ে উঠলাম। কোরআন-হাদিস ভালোমতো ঘেঁটে বুঝতে পারলাম, কোরআনের সবকিছুই মোহাম্মদের নিজের বানানো। ইসলামের আল্লাহকে মনে হল হিংসুক, প্রতিশোধপরায়ণ, রক্তলোলুপ একজন মানুষ। আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তাদের রোগব্যাধি ও বালা-মুসিবত ইত্যাদি সারাবার জন্য কিংবা মনের আশা পূরণ করার জন্য মসজিদের ইমামদের কাছে গিয়ে তাবিজ নেয়, অথবা পানিপড়া নেয়। পানিপড়া দেয়ার সময় ইমাম সাহেব ফিসফিস করে কী পড়ে পানিতে ফুঁ দেয় সেটা কিন্তু লোকজন জানেনা। লোকজন কেবল বিশ্বাস করে, ইমাম সাহেব কোরআনের আয়াত পড়েই ফুঁ দিচ্ছেন, আর এ কারণে পড়াপানি খেলে আমার রোগমুক্তি ঘটবে। আমি যখন ইসলামে অবিশ্বাসী অথচ মসজিদের ইমাম সেই সময়েও মানুষকে আমার পানিপড়া দিতে হত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি মানুষ সুস্থ হয়ে যাচ্ছে অথচ তখন সময় আমি হরেকৃষ্ণ হরেরাম বলে কিংবা রবিঠাকুরের কবিতার লাইন বলে পানিতে ফুঁ দিতাম। আর সেই পানি খেয়ে লোকজন সুস্থ হত। আমার এক মুসল্লি (যারা ইমামের পিছনে নামাজ পড়ে তাদের মুসল্লি বলা হয়) আমাকে বলেছিলেন, “হুজুর, আপনি আল্লাহর ওলী, আপনি পানিপড়া দিলে যত কঠিন রোগ হোক সুস্থ হয়ে যায় মানুষ।” আবার চলে যাই আব্বাসউদ্দীন প্রসঙ্গে। যারা আব্বাসউদ্দীনের গান ভালোবাসে তাঁরা সবাই জানে, বৃষ্টি নামাতে আব্বাসউদ্দীনের গানের কোন ঐশ্বরিক ভূমিকা নেই। আব্বাসউদ্দীনের গানের কথা শুনে কোন ঈশ্বর বৃষ্টি নামিয়ে দেননি। বৃষ্টিটা প্রাকৃতিক কারণেই হয়েছে। যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদকে ভালোবাসে তারা বিশ্বাস করে, মোহাম্মদের প্রার্থনা আল্লাহ ফেলতে পারেননি তাই তিনি বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলায় একটা কথা আছে, “ঝড়ে বক মরে পীর সাহেবের কেরামতি বাড়ে।” ইসলামের নবী মোহাম্মদের ছিল বহু দূর-দূরান্তের খবর দেয়ার ক্ষমতা। তিনি মক্কায় বসে বসে জেরুজালেমের মসজিদ দেখতে পেতেন। তিনি একরাতেই চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, গ্যালাক্সি, মিল্কিওয়ে, ব্ল্যাকহোল সবকিছু ছাড়িয়ে সাত আসমানের উপরে গিয়ে আল্লাহর সাথে দেখা করে আবার নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, মানুষের মৃত্যুর পর কি হবে এইসব খবর ছিল তার নখদর্পণে। তিনি হাতের ইশারা দিয়ে চাঁদকে দুই টুকরো করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এই মানুষটিই জানতে পারলেন না যে, তিনি যে খাবার খাচ্ছেন তার মধ্যে বিষ মেশানো আছে, আর সেই বিষের ক্রিয়ায় তিনি আক্রান্ত হন। এক বছরের অধিককাল বিষের ক্রিয়ায় ভুগে অবশেষে তিনি মারা গেলেন। চলুন বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত আরেকটি গল্প বলা যাক: এক পীর সাহেবকে তার মুরিদ (ভক্ত) নিমন্ত্রণ করেছে নিজ বাড়িতে। পীর সাহেব সেখানে গিয়ে অত্যন্ত স্বয়ম্ভরতার সাথে আসন গেড়ে বসলেন। ভক্তি গদগদ ভক্ত তাকিয়ে আছে পীর সাহেবের মুখপানে। হঠাৎ পীর সাহেব বললেন, “এখানে তুই কি করছিস? যা, যা বলছি তাই!” ভক্ত পীর সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, কাকে তাড়ালেন? পীর সাহেব বললেন, আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখলাম মক্কা শরীফের মসজিদের মধ্যে একটি কুকুর ঢুকেছে। কুকুরটিকে তাড়িয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর পীর সাহেবকে খাবার দেয়া হলো। বড় একটি প্লেট ঠেসে ভাত দেয়া হয়েছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল তরকারি দেয়া হচ্ছে না। শেষমেষ পীর সাহেব বললেন, আরে তরকারি দিচ্ছ না কেন? নিরস কণ্ঠে ভক্ত বললেন, হুজুর আপনি এখানে বসে হাজার হাজার মাইল দূরের মক্কা শরীফে কি ঘটছে তা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু আপনার ভাতের তলে যে মাছ-মাংস লুকিয়ে রেখেছি সেটা দেখতে পেলেন না? ভারতে যদি কোন ভূমিকম্প হয় তাহলে বাংলাদেশের বিশ্বাসী মুসলিমরা সেটাকে আল্লাহর গজব (ক্রুদ্ধ হয়ে শাস্তিদান) মনে করে। কিন্তু যদি ভূমিকম্পটি মুসলিম প্রধান পাকিস্তানে হয় তাহলে সেটা আল্লাহর পরীক্ষা! ইসলামের নবী মোহাম্মদের জীবনের শেষ ১০ বছর ছিল যুদ্ধ আর রক্তপাতে ভরা। মুসলিমরা কোথাও যুদ্ধ করতে গেলে যুদ্ধের পরপর সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে কোরআনের আয়াত নাজিল হত। মুসলিমরা জয়লাভ করলে ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ কোরআনে বলতেন – আমি সাহায্য করেছি তাই তোমরা জিতেছ। মুসলমানরা পরাজিত হলে ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ বলতেন – আমি তোমাদের ঈমানের পরীক্ষা নিলাম। কোরআনের সূরা আলে ইমরানের (সূরা নাম্বার ০৩) ১২৩ নম্বর আয়াতে আছে: “আল্লাহ তোমাদেরকে বদর প্রান্তরে (বদরের যুদ্ধে) সাহায্য করেছিলেন যখন তোমরা ছিলে দুর্বল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর যাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।” বদর যুদ্ধের একবছর পরেই যখন ওহুদের যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয় তখন আল্লাহ ভোল পাল্টে ফেলেন। তিনি তখন বলেন: “যেদিন দুই দল (মুসলিম এবং অমুসলিমরা) মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল সেদিন তোমাদের যাক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা ছিল আল্লাহরই নির্দেশক্রমে আর আল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন বিশ্বাসীদের তিনি আল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন বিশ্বাসী এবং কপটদের (মধ্যেকার ফারাক)….” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৬-১৬৭) আপনি যদি কোন পীরের কাছে গিয়ে আপনার কোন অসুবিধার কথা কিংবা আপনার মনোবাঞ্ছার কথা জানান আর পীর সাহেব যদি দোয়া করে দেন, এবং দোয়া করা সত্ত্বেও যদি আপনার অসুবিধা দূর না হয় কিংবা মনোবাঞ্ছা পূরণ না হয় তাহলে দোষটা কিন্তু আপনার! আপনার ঈমানে দুর্বলতা ছিল। পক্ষান্তরে যদি আপনার অসুবিধা দূর হয় কিংবা মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় তাহলে কৃতিত্ব কিন্তু হুজুরের, কারণ তাঁর দোয়া এখানে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য ওহাবী হুজুররা পীর সাহেবদের তেমন কৃতিত্ব দিতে নারাজ। তাঁরা সব কৃতিত্ব দিতে চায় আল্লাহকে। ঘুরেফিরে সেই একই কথা – আল্লাহ হচ্ছেন সেই ঠুঁটো জগন্নাথ যার অস্তিত্বই নেই, আর পীর হচ্ছেন ঠুঁটো জগন্নাথের সেক্রেটারি যিনি নাম ভাঙিয়ে পয়সা খান। এই প্রশ্নগুলো করা যেতে পারে কিনা যে, মোহাম্মদের প্রার্থনায় যদি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে তাঁর কেন যুদ্ধ করে ইসলাম কায়েম করতে হলো? তিনি কেন প্রার্থনা করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না? মোহাম্মদের দাবি যদি তথাকথিত আল্লাহ ফেলতে না পারেন তাহলে দেশপ্রেমিক মোহাম্মদের কি উচিত ছিল না তাঁর দেশে যেন প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় সে জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যাওয়া? আমি জানি না, মোহাম্মদের কি দেশপ্রেমের ঘাটতি ছিল নাকি মোহাম্মদের প্রার্থনা শুনতে আল্লাহর অনীহা ছিল? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে নবীর দেশে কেন পর্যাপ্ত পরিমাণে তিনি বৃষ্টি দেন না? নবীর দেশে কেন সারাবছর প্রবাহিত থাকে এমন একটি নদী নেই? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে নবী আসার পর নবীর দেশকে কেন আল্লাহ সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা করে দেননি? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে কেন নবীর আগমনের পর ঊষর মরুভূমির দেশটির তীব্র তাপদাহ কমিয়ে দেননি? যে নবী দুনিয়াতে বসে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারে সে নবী কি তার দেশের জন্য প্রতিবছর পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করে যেতে পারলেন না? কখনো কি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে দেখেছেন হে বিশ্বাসী বন্ধু?
শুরু করা যাক একটি গল্প দিয়ে। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় বেড়াতে গেলেন চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই। চীনের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। অনুষ্ঠানে গানও পরিবেশিত হয়েছে। সবার শেষ গান গাইলেন কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আর গানটি ছিল “আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই আল্লা মেঘ দে”। গান শেষ হতেই সকলে দেখল বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সেদিন চৌ এন লাই বলেছিলেন: “হয়তো অনেক কিছুই আমি মনে রাখতে পারব না, কিন্তু যা আমি আজীবন মনে রাখব তা হলো- একজন শিল্পী কীভাবে গান গেয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারেন।” (তথ্যসূত্র: সা রে গা মা বেঙ্গল) ইসলাম ধর্মে, খুব বেশি খরা ও অনাবৃষ্টি হলে তখন আল্লাহর কাছে বিশেষ ধরনের নামায পড়তে হয় যাকে বলা হয় সালাতুল ইস্তিসকা। বাংলাদেশের যশোরের এক পীর সাহেবের গল্প বলছি শুনুন। একবার বাংলাদেশে প্রচন্ড খরা দেখা দিল। বৃষ্টি নেই, জমির ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে, গরমে মানুষের জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। লোকজন গিয়ে পীর সাহেবকে বলল, হুজুর আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। পীর সাহেব একদিন ইস্তিসকার নামাযের আয়োজন করলেন। নামাজ হলো, নামাজের নামাজের পর প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি চাওয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামল। পীর সাহেবের কেরামতি বেড়ে গেল। লোকজন বলাবলি করল, পীর সাহেবের সাথে আল্লাহর ‘হট কানেকশন’ আছে। চলুন একটু হাদিসের গল্প শুনে আসি: আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পশুগুলো মারা যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট (বৃষ্টির জন্য) দু’আ করুন। তখন তিনি দু’আ করলেন। ফলে এক জুমু’আ থেকে অপর জুমু’আ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হতে থাকল। এরপর এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘরবাড়ী বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলো মারা যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! পাহাড়ের উপর, টিলার উপর, উপত্যকা এলাকায় এবং বনাঞ্চলে বর্ষণ করুন। ফলে মদিনা থেকে মেঘ এরূপভাবে কেটে গেল যেমন কাপড় ফেড়ে ফাঁক হয়ে যায়। প্রতিটি বিশ্বাসে মুসলিম মনে করে, সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা তথা নবী মোহাম্মদের প্রার্থনার কারণে। আমার শৈশবের ঘটনা বলছি শুনুন: ঢাকার হাজারীবাগে একবার বৃষ্টির জন্য নামাযের আয়োজন হয়েছিল। আমি সেখানে আমার বাবার সাথে গিয়েছিলাম। হাজারীবাগ বড় মসজিদের ইমাম নামাজ ও প্রার্থনার নেতৃত্ব দিলেন। সেদিন মানুষের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহর ভান্ডার থেকে বৃষ্টি পাঠানো হল না। যদি বৃষ্টি নামত তাহলে ওই ইমাম সাহেবের পীর সাহেব হয়ে যেতে আর সময় লাগত না। প্রমাণ হয়ে যেত ইমাম সাহেবের সাথে আল্লাহর হট কানেকশন আছে। আমি নিজেও একসময় মসজিদের ইমাম ছিলাম। সে সময়ে ইমামতি করতে করতে এক পর্যায়ে ইসলামের প্রতি বিতৃষ্ণা হয়ে উঠলাম। কোরআন-হাদিস ভালোমতো ঘেঁটে বুঝতে পারলাম, কোরআনের সবকিছুই মোহাম্মদের নিজের বানানো। ইসলামের আল্লাহকে মনে হল হিংসুক, প্রতিশোধপরায়ণ, রক্তলোলুপ একজন মানুষ। আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তাদের রোগব্যাধি ও বালা-মুসিবত ইত্যাদি সারাবার জন্য কিংবা মনের আশা পূরণ করার জন্য মসজিদের ইমামদের কাছে গিয়ে তাবিজ নেয়, অথবা পানিপড়া নেয়। পানিপড়া দেয়ার সময় ইমাম সাহেব ফিসফিস করে কী পড়ে পানিতে ফুঁ দেয় সেটা কিন্তু লোকজন জানেনা। লোকজন কেবল বিশ্বাস করে, ইমাম সাহেব কোরআনের আয়াত পড়েই ফুঁ দিচ্ছেন, আর এ কারণে পড়াপানি খেলে আমার রোগমুক্তি ঘটবে। আমি যখন ইসলামে অবিশ্বাসী অথচ মসজিদের ইমাম সেই সময়েও মানুষকে আমার পানিপড়া দিতে হত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি মানুষ সুস্থ হয়ে যাচ্ছে অথচ তখন সময় আমি হরেকৃষ্ণ হরেরাম বলে কিংবা রবিঠাকুরের কবিতার লাইন বলে পানিতে ফুঁ দিতাম। আর সেই পানি খেয়ে লোকজন সুস্থ হত। আমার এক মুসল্লি (যারা ইমামের পিছনে নামাজ পড়ে তাদের মুসল্লি বলা হয়) আমাকে বলেছিলেন, “হুজুর, আপনি আল্লাহর ওলী, আপনি পানিপড়া দিলে যত কঠিন রোগ হোক সুস্থ হয়ে যায় মানুষ।” আবার চলে যাই আব্বাসউদ্দীন প্রসঙ্গে। যারা আব্বাসউদ্দীনের গান ভালোবাসে তাঁরা সবাই জানে, বৃষ্টি নামাতে আব্বাসউদ্দীনের গানের কোন ঐশ্বরিক ভূমিকা নেই। আব্বাসউদ্দীনের গানের কথা শুনে কোন ঈশ্বর বৃষ্টি নামিয়ে দেননি। বৃষ্টিটা প্রাকৃতিক কারণেই হয়েছে। যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদকে ভালোবাসে তারা বিশ্বাস করে, মোহাম্মদের প্রার্থনা আল্লাহ ফেলতে পারেননি তাই তিনি বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলায় একটা কথা আছে, “ঝড়ে বক মরে পীর সাহেবের কেরামতি বাড়ে।” ইসলামের নবী মোহাম্মদের ছিল বহু দূর-দূরান্তের খবর দেয়ার ক্ষমতা। তিনি মক্কায় বসে বসে জেরুজালেমের মসজিদ দেখতে পেতেন। তিনি একরাতেই চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, গ্যালাক্সি, মিল্কিওয়ে, ব্ল্যাকহোল সবকিছু ছাড়িয়ে সাত আসমানের উপরে গিয়ে আল্লাহর সাথে দেখা করে আবার নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, মানুষের মৃত্যুর পর কি হবে এইসব খবর ছিল তার নখদর্পণে। তিনি হাতের ইশারা দিয়ে চাঁদকে দুই টুকরো করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এই মানুষটিই জানতে পারলেন না যে, তিনি যে খাবার খাচ্ছেন তার মধ্যে বিষ মেশানো আছে, আর সেই বিষের ক্রিয়ায় তিনি আক্রান্ত হন। এক বছরের অধিককাল বিষের ক্রিয়ায় ভুগে অবশেষে তিনি মারা গেলেন। চলুন বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত আরেকটি গল্প বলা যাক: এক পীর সাহেবকে তার মুরিদ (ভক্ত) নিমন্ত্রণ করেছে নিজ বাড়িতে। পীর সাহেব সেখানে গিয়ে অত্যন্ত স্বয়ম্ভরতার সাথে আসন গেড়ে বসলেন। ভক্তি গদগদ ভক্ত তাকিয়ে আছে পীর সাহেবের মুখপানে। হঠাৎ পীর সাহেব বললেন, “এখানে তুই কি করছিস? যা, যা বলছি তাই!” ভক্ত পীর সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, কাকে তাড়ালেন? পীর সাহেব বললেন, আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখলাম মক্কা শরীফের মসজিদের মধ্যে একটি কুকুর ঢুকেছে। কুকুরটিকে তাড়িয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর পীর সাহেবকে খাবার দেয়া হলো। বড় একটি প্লেট ঠেসে ভাত দেয়া হয়েছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল তরকারি দেয়া হচ্ছে না। শেষমেষ পীর সাহেব বললেন, আরে তরকারি দিচ্ছ না কেন? নিরস কণ্ঠে ভক্ত বললেন, হুজুর আপনি এখানে বসে হাজার হাজার মাইল দূরের মক্কা শরীফে কি ঘটছে তা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু আপনার ভাতের তলে যে মাছ-মাংস লুকিয়ে রেখেছি সেটা দেখতে পেলেন না? ভারতে যদি কোন ভূমিকম্প হয় তাহলে বাংলাদেশের বিশ্বাসী মুসলিমরা সেটাকে আল্লাহর গজব (ক্রুদ্ধ হয়ে শাস্তিদান) মনে করে। কিন্তু যদি ভূমিকম্পটি মুসলিম প্রধান পাকিস্তানে হয় তাহলে সেটা আল্লাহর পরীক্ষা! ইসলামের নবী মোহাম্মদের জীবনের শেষ ১০ বছর ছিল যুদ্ধ আর রক্তপাতে ভরা। মুসলিমরা কোথাও যুদ্ধ করতে গেলে যুদ্ধের পরপর সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে কোরআনের আয়াত নাজিল হত। মুসলিমরা জয়লাভ করলে ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ কোরআনে বলতেন – আমি সাহায্য করেছি তাই তোমরা জিতেছ। মুসলমানরা পরাজিত হলে ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ বলতেন – আমি তোমাদের ঈমানের পরীক্ষা নিলাম। কোরআনের সূরা আলে ইমরানের (সূরা নাম্বার ০৩) ১২৩ নম্বর আয়াতে আছে: “আল্লাহ তোমাদেরকে বদর প্রান্তরে (বদরের যুদ্ধে) সাহায্য করেছিলেন যখন তোমরা ছিলে দুর্বল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর যাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।” বদর যুদ্ধের একবছর পরেই যখন ওহুদের যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হয় তখন আল্লাহ ভোল পাল্টে ফেলেন। তিনি তখন বলেন: “যেদিন দুই দল (মুসলিম এবং অমুসলিমরা) মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল সেদিন তোমাদের যাক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা ছিল আল্লাহরই নির্দেশক্রমে আর আল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন বিশ্বাসীদের তিনি আল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন বিশ্বাসী এবং কপটদের (মধ্যেকার ফারাক)….” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৬-১৬৭) আপনি যদি কোন পীরের কাছে গিয়ে আপনার কোন অসুবিধার কথা কিংবা আপনার মনোবাঞ্ছার কথা জানান আর পীর সাহেব যদি দোয়া করে দেন, এবং দোয়া করা সত্ত্বেও যদি আপনার অসুবিধা দূর না হয় কিংবা মনোবাঞ্ছা পূরণ না হয় তাহলে দোষটা কিন্তু আপনার! আপনার ঈমানে দুর্বলতা ছিল। পক্ষান্তরে যদি আপনার অসুবিধা দূর হয় কিংবা মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় তাহলে কৃতিত্ব কিন্তু হুজুরের, কারণ তাঁর দোয়া এখানে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য ওহাবী হুজুররা পীর সাহেবদের তেমন কৃতিত্ব দিতে নারাজ। তাঁরা সব কৃতিত্ব দিতে চায় আল্লাহকে। ঘুরেফিরে সেই একই কথা – আল্লাহ হচ্ছেন সেই ঠুঁটো জগন্নাথ যার অস্তিত্বই নেই, আর পীর হচ্ছেন ঠুঁটো জগন্নাথের সেক্রেটারি যিনি নাম ভাঙিয়ে পয়সা খান। এই প্রশ্নগুলো করা যেতে পারে কিনা যে, মোহাম্মদের প্রার্থনায় যদি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে তাঁর কেন যুদ্ধ করে ইসলাম কায়েম করতে হলো? তিনি কেন প্রার্থনা করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না? মোহাম্মদের দাবি যদি তথাকথিত আল্লাহ ফেলতে না পারেন তাহলে দেশপ্রেমিক মোহাম্মদের কি উচিত ছিল না তাঁর দেশে যেন প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় সে জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যাওয়া? আমি জানি না, মোহাম্মদের কি দেশপ্রেমের ঘাটতি ছিল নাকি মোহাম্মদের প্রার্থনা শুনতে আল্লাহর অনীহা ছিল? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে নবীর দেশে কেন পর্যাপ্ত পরিমাণে তিনি বৃষ্টি দেন না? নবীর দেশে কেন সারাবছর প্রবাহিত থাকে এমন একটি নদী নেই? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে নবী আসার পর নবীর দেশকে কেন আল্লাহ সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা করে দেননি? আল্লাহ যদি তার নবীকে এতই ভালোবাসেন তাহলে কেন নবীর আগমনের পর ঊষর মরুভূমির দেশটির তীব্র তাপদাহ কমিয়ে দেননি? যে নবী দুনিয়াতে বসে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারে সে নবী কি তার দেশের জন্য প্রতিবছর পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করে যেতে পারলেন না? কখনো কি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে দেখেছেন হে বিশ্বাসী বন্ধু?
