Mufti Masud
২০০১ সাল। আমি ঢাকার উত্তরার বায়তুসসালাম মাদ্রাসার ছাত্র। মাদ্রাসায় আমাদেরকে কোরআন এবং হাদিস থেকে পাঠদান করা হচ্ছিল নারীর সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে। অবাধ্য স্ত্রীকে পেটানো, নারীকে সম্পত্তিতে ঠকানো ইত্যাদির মধ্যেই রয়েছে নারীর চরম ও পরম সম্মান, এটাই তখন আমি জানতাম। একজন পুরুষ চাইলেই চারটে বিয়ে করতে পারে, পুরুষ চাহিবামাত্র তার স্ত্রীকে মুখের কথায় বিদায় করতে পারে, কারণ আল্লাহ বলেছেন নারীর উপরে রয়েছে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহর নবী মোহাম্মদ বলেছেন নারীর বুদ্ধি অসম্পূর্ণ। আল্লাহ কোরআনে নারীকে পায়খানার সাথে তুলনা করেছেন, আল্লাহর নবী মোহাম্মদ নারীকে কুকুর ও গাধার সাথে তুলনা করেছেন। আর এ ধরনের তুলনার মধ্যেই রয়েছে নারীর জন্য সর্বোচ্চ সম্মান, এই-ই ছিল মাদ্রাসার প্রধানতম পাঠ্য। আমি তখন এসব কথা বিশ্বাস করতাম, কিন্তু আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতো যখন দেখতাম আমাদের গ্রামের মহের আলী তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে পেটাত, আমার শিক্ষক মুফতি বশির আহমদ তার স্ত্রীকে প্রতিদিন শাস্তি দিত। সমাজের সব পুরুষই নারীকে দমন করে রাখা তার জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে পালন করত। আমার মনে প্রশ্ন জাগত, সমাজের প্রত্যেক নারী কি পুরুষের দ্বারা এভাবে নিগৃহীত হতে থাকবে? নারী কি আসলেই মানুষ নয়? মার খাওয়াই কি তার নিয়তি? মনে প্রশ্ন জাগত, নারী কি সত্যিই নাকেসাতুল আকল (অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন) যেমনটি বলেছেন নবীজি?
আমাদের শিক্ষকরা আমাদেরকে একজন মানুষ সম্পর্কে খুব সাবধান করতেন, তার বই পড়তে নিষেধ করতেন। সে মানুষটিকে আমাদের শিক্ষকেরা বহু রকমের গালি দিয়ে মজা পেতেন। বারবার নাম শুনতে শুনতে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল, সে মানুষটির বই আমি পড়তে আগ্রহী হলাম। বাবার দেয়া টিফিনের টাকা জমিয়ে নিলক্ষেত থেকে কিনলাম নির্বাচিত কলাম ও লজ্জা। বই পড়ে আমার মনে হতো লাগলো, আমি যা শিখছি, আমি আরবিতে লেখা যে সব বই পড়ছি, আমার আরবিতে লেখা বইয়ে নারীকে যে দৃষ্টিতে তুলে ধরা হয়েছে তার চেয়ে ভালো কথা আছে এই বাংলা বইয়ে।
তবুও কেন যেন চিন্তার কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। বই পড়তাম। বই ভালো লাগতো, কিন্তু বই পড়া শেষে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে অভিশাপ দিতাম। স্বভাবের কি এক বিচিত্র বৈপক্ষমতা! জেলখানার মনো-শোষণের কি এক অপার ক্ষমতা!
একজন মাদক ব্যবসায়ী যেভাবে পুলিশের কাছ থেকে তার মাদককে লুকিয়ে রাখে আমাকেও তখন তসলিমা নাসরিনের বই সেভাবে লুকিয়ে রেখে পড়তে হতো। আমি অনুভব করতাম, এ বই যেন বই নয়, এ যেন ভয়ঙ্কর মারিজুয়ানা! এ বই যেন বই নয়, এ যেন কালাশনিকভ রাইফেল! ২০০১ সালের শেষদিকে তসলিমা নাসরিনের বই পড়ে হুজুরদের কাছে ধরা খেলাম। হুজুরদের সে কি ক্রোধ! সে কি উন্মাদনা! আমাকে পারে তো চিবিয়ে খেয়ে ফেলে! বই পড়ার অপরাধে আমাকে পিটিয়ে দুটো বেত ভেঙেছিল বাইতুস সালাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল নরাধম মাওলানা আব্দুল হাই।
আজ আমার প্রিয় মানুষের জন্মদিন। তিনি চিরকাল তার কর্মময়তা দিয়ে বেঁচে থাকুন মানুষের মধ্যে। নিপাত যাক পুরুষতান্ত্রিকতা, ধরা পড়ুক ধর্মের ধ্যাষ্টামো, অবারিত হোক নারীর স্বাধীনতা। ২০২১ সালের এই আমি যেন আজ নিমিষেই ফিরে গেছি ২০০১ সালে, আর বলছি, না আমি নারীর বিরুদ্ধে ঘৃণা শিখতে চাই না।
(তসলিমা নাসরিনের কোন এক জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলাম)