Mufti Masud

ড. কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় রচিত বই ‘একুশের মিথ, জয়বাংলার মিথ্যা’ এর জন্য একটি ভূমিকা লিখেছিলাম। সেটিই এখানে তুলে ধরলাম পাঠকদের সৌজন্যে। ‘একুশের মিথ, জয়বাংলার মিথ্যা’ বইটি ক্রয় করার এবং পাঠ করার বিশেষ অনুরোধও করছি সবাইকে।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি / আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। না, আমি আসলে আমার পূর্বপুরুষের কথা বলতে চাই না। আমি বলতে চাই আমারই কথা। আমি কিংবদন্তির কথা বলছি এটি বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি কবিতা। লিখেছিলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। এমন একটি জ্বালাময়ী কবিতা যে বাংলা সাহিত্যে আছে তা বহু বছর ধরে জানতাম না। জানার কথাও না, কারণ আমি ছিলাম কারাগারের বাসিন্দা। আমি যে কারাগারে বন্দি ছিলাম সেই কারাগারের নাম মাদ্রাসা। মাদ্রাসা নামক কারাগারে বন্দি করা হয় লাখো শিশুকে, এবং সারা বছর ধরে। এখানে বন্দি করা হয় এমন লাখো শিশুকে যাদের কোনো অপরাধ নেই। হ্যাঁ, এখানে বন্দি করার পর তাদের ব্রেনওয়াশ করা হয় এবং তাদেরকে অপরাধপ্রবণ বানানো হয়।
২০০২ সালের কোন একদিনের কথা। তখন আমি ঢাকার জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। ক্লাসে আমাদের শিক্ষক মাওলানা আহমদ মায়মুন আমাদেরকে ভারতে মুসলিমদের উপরে চলমান নির্যাতনের বিষয়ে কথা বলছিলেন। তিনি আমাদের বললেন, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারতের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে ১৪ হাজার আলেমকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল আর এখন ভারতে প্রতিদিনই পিটিয়ে এবং গুলি করে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিমদের মসজিদ এবং মাদ্রাসাসমূহ ভেঙে দেয়া হচ্ছে এবং মুসলিমরা বাস্তবচ্যুত হচ্ছে। তাছাড়া হিন্দু ধর্মের সমালোচনা কেউ করলেই উগ্র হিন্দুরা সমালোচনাকারীকে খুন করছে। আমি খুব বইপোকা ছিলাম। এর কিছুদিন পর ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকার একটি পুরনো বইয়ের দোকানে দেখলাম কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা। এর নাম ‘দেশ’। পত্রিকাতে অনেকগুলো পৃষ্ঠা,কিন্তু দাম মাত্র ১৫ টাকা। আমি কিনে নিলাম। এই পত্রিকার পরতে পরতে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লেখা রয়েছে, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধেও লেখা রয়েছে। আর এখানে আমি যাদের কলাম পড়ছি তাঁরা সকলেই হিন্দু। তাঁরা হিন্দু ধর্মের তীব্র সমালোচনা করছেন এবং তাদের লেখালেখির ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা কেউই ভারত থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্য দেশে বসে লিখছেন না, বরং ভারতে বসেই তাঁরা লিখছেন। তাহলে আমার শিক্ষক মাওলানা আহমদ মায়মুনের কাছ থেকে যে ভারতের গল্প শুনলাম সেটি কোন ভারত? সেই ভারত কোন মহাদেশে অবস্থিত?
আরেকটি ঘটনা বলছি। ২০২৩ সালের শেষের দিকের কথা। তখন আমি কলকাতায় থাকি। আমার ভারতীয় কয়েকজন বন্ধুর সাথে আমি কথা বলছিলাম। তাঁরা সবাই বামপন্থী। তাঁরা আমাকে জানালেন যে, গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা কলকাতায় মিছিল করেছেন। কয়েকদিন পরে আরও একটি মিছিলে তাঁরা যোগ দেবেন। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, হামাস সম্পর্কে আপনাদের কি ধারণা? তাঁরা জানালেন, হামাস একটি স্বাধীনতাকামী সংগঠন আর ইসরায়েল হচ্ছে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। আমি বললাম, হামাসের পোশাকি নাম জানেন? তাঁরা জানেন না। আমি বললাম এবং সাথে ইন্টারনেট থেকেও দেখালাম যে, হামাসের পোশাকি নাম হচ্ছে ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন। এই মানুষগুলো বেশ অবাক হলেন। তাদেরকে আমি এরপর উইকিপিডিয়া থেকে হামাস চ্যাপ্টার দেখালাম। হামাস চ্যাপ্টার তাঁরা যতটুকু দেখলেন তাতে বুঝতে পারলেন, হামাস মূলত ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। হামাস ইহুদিদের নির্মূল করতে চায়। ইহুদিদের নির্মূল করতে চাওয়ার কারণ ইসলামের প্রতি তাদের বিশ্বাস। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ধরে ধরে ইহুদিদের হত্যা করতে, এমনকি কোন ইহুদি যদি গাছের আড়ালে কিংবা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তবে সেখান থেকেও তাঁকে ধরে নিয়ে হত্যা করতে হবে। শুধু তাই না, মোহাম্মদ বলেছিলেন যে, শেষ জামানায় অর্থাৎ পৃথিবী ধ্বংসের পূর্ব মুহূর্তে গাছের পেছনে কিংবা পাথরের পেছনে কোন ইহুদি লুকিয়ে থাকলে সেই গাছ এবং পাথরের জবান খুলে যাবে এবং গাছ ও পাথর তখন বলবে, হে মুসলমান আমার পেছনে একটা ইহুদি লুকিয়ে আছে, তাঁকে তুমি হত্যা করো।
আমি আমার বন্ধু প্রফেসর কৌশিক গাঙ্গুলির সাথে পরিচিত হয়েছি অল্প কিছুদিন আগে, আমার প্রিয় দাদা গৌতম বসুর মাধ্যমে। তাঁর সাথে কথা বলে তাঁকে খুব সজ্জন মানুষ মনে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ইসলাম, রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন তিনি কথা বলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এর মধ্যে ক্রমবিকাশমান ইসলামী মৌলবাদ নিয়ে তিনি যে ধরনের গবেষণামূলক এবং বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করেছেন তা এক কথায় অসাধারণ! বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদ ও জাতীয়তাবাদের আড়ালে থাকা ইসলামিক উগ্রবাদ এসব কিছু নিয়ে তিনি যেভাবে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং লিখেছেন তা সম্ভবত কোন ভারতীয়দের মধ্যে এই প্রথম। আমি এ বইটি পড়ার জন্য সকল ভারতীয়কে অনুরোধ করছি, বিশেষতঃ যারা বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী বা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চান তাদেরকে অবশ্যই। এছাড়া আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি এজন্য যে, এই বইটিকে তিনি বাংলাদেশের নিহত ব্লগারদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশের নিহত ব্লগারদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন অভিজিৎ রায়। তাঁকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ইসলামিক জিহাদিরা কুপিয়ে হত্যা করেছিল। অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি ছিলেন অনেকটা বাম ঘরানার একজন মানুষ। আমি যখন মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম তখন পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখি প্রচুর পড়তাম। অধ্যাপক অজয় রায়ের লেখালেখিও আমি পড়েছি বেশ কয়েকবার। যতবারই আমি তাঁর লেখা পড়েছি ততবারই মনে হয়েছে তিনি সমাজে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন চাইছেন। তিনি চাইছেন মানুষ যেন সেকুলার হয় এবং মানুষ যেন অসাম্প্রদায়িক হয়, কিন্তু তাঁর সেসব চাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অধিকাংশ লেখাতেই পশ্চিমা সমাজব্যবস্থা, পুঁজিবাদ ইত্যাদি অনেক কিছুকে আক্রমণ করতেন এবং পশ্চিমা দর্শন এবং পুঁজিবাদকে তিনি মানুষের প্রগতির অন্তরায় মনে করতেন। ইসলামী মৌলবাদকে অধ্যাপক অজয় রায় আক্রমণ করেননি কখনোই। অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায় হিন্দু ধর্মের যতটা সমালোচনা করেছেন ইসলামের সমালোচনা ততটা করেননি। তবে হ্যাঁ, তিনি যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি মুক্তমনা নামের একটি ব্লগসাইট পরিচালনা করতেন। মুক্তমনা ব্লগে বাংলাদেশের এক্স-মুসলিমদের অনেকেই লিখতেন। যে অজয় রায় ইসলামের বিপক্ষে জোরালো কোন অবস্থান নিলেন না সেই অজয় রায়ের ছেলে কিন্তু ইসলামী মৌলবাদীদের হাতেই খুন হয়ে গেলেন! যখন অভিজিৎ রায়কে ঘাতকরা কুপিয়েছিল তখন তাঁরা আল্লাহু আকবার বলে চিৎকার করছিল। শুধু অভিজিৎই না, বাংলাদেশে যখনই কোন নাস্তিক, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা করেছে ইসলামিক জিহাদিরা তখনই তারা আল্লাহু আকবার বলে চিৎকার করেছে। হত্যা করার সময় আল্লাহু আকবার বলা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। মুসলমানরা যখনই কোন মানুষ কিংবা পশুকে জবাই করে তখনই তাঁরা আল্লাহু আকবার বলে। ইসলাম যেহেতু ধর্মের মুখোশ পরে থাকা একটি ঘৃণা এবং বিদ্বেষে পরিপূর্ণ জীবন দর্শন সুতরাং এই দর্শনের যিনি গুরু অর্থাৎ মোহাম্মদ তিনিও ছিলেন ঘৃণা এবং নারীবিদ্বেষে পরিপূর্ণ একজন মানুষ। তিনি তাঁর নারীবিদ্বেষী নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য এবং নারীবিদ্বেষী ও ‘কাফেরবিদ্বেষী’ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসংখ্য যুদ্ধ করেছিলেন। এসব যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আর ইহুদিদেরকে তিনি ধরে ধরে জবাই করে হত্যা করেছিলেন সেই যুগে, যেটিকে স্পষ্টতই গণহত্যা বলা যেতে পারে। মোহাম্মদ যখনই যুদ্ধে যেতেন এবং যুদ্ধ শুরু করতেন কিংবা অমুসলিম কাউকে হত্যা করতেন কিংবা মুহাম্মদের অনুসারীরা যখনই কাউকে হত্যা করত তখন তাঁরা সবাই আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করত। আল্লাহু আকবার অর্থ আল্লাহ সবচেয়ে বড়। ইসলামের আল্লাহকে বড় হিসেবে প্রমাণ করতে হলে কাফেরদের (অমুসলিম) হয় মেরে ফেলতে হবে নয়তো ইসলামে কনভার্ট করতে হবে। এটাই ইসলামের আইন। আমেরিকান লেখক মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর ‘The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History’ বইয়ে মোহাম্মদকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে এক নাম্বার হিসেবে গণ্য করেছিলেন। মোহাম্মদকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি মানতে রাজি আছি, কিন্তু সেটা অন্যভাবে। কোন একটি ট্রেনে কিংবা শপিংমলে কিংবা লোকে পরিপূর্ণ কোন অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী বাক্য কি হতে পারে বলে আপনি মনে করছেন? আমি কিন্তু মোহাম্মদের আবিষ্কৃত আল্লাহু আকবার শব্দটাকেই সবচেয়ে প্রভাবশালী বাক্য মনে করি। আপনার হাতে যদি একটি ব্যাগ থাকে এবং আপনি যদি আল্লাহু আকবার বলে ব্যাগটিকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলেন তাহলে দেখবেন মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেন খালি হয়ে। একইভাবে, খালি হয়ে যাবে শপিংমল, খালি হয়ে যাবে লোকে লোকারণ্য অনুষ্ঠানস্থল। লোকেরা এমনভাবে পড়িমরি করে ছুটবে যে, হয়তো অনেকেই তাদের সেলফোন কিংবা হাতে থাকা ব্যাগ ফেলে দিয়ে পালাবে! অন্য কোন ধর্মগুরুর আবিষ্কৃত কোন বাক্যই আল্লাহু আকবারের মতো এত ত্রাস সৃষ্টিকারী না।
বাংলাদেশে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। প্রথম হচ্ছে জেনারেল শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে সাধারণভাবে বিজ্ঞান, গণিত, ধর্ম, ইংরেজি ভাষা ইত্যাদি অনেক কিছুই শেখানো হয়। দ্বিতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে আলিয়া মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। আলিয়া মাদ্রাসা বাংলাদেশ সরকারের দ্বারা পরিচালিত এক ধরনের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, এসব কিছু শেখানো হয়। আর তৃতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বৈশ্বিক হেডকোয়ার্টার ভারতেই রয়েছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা হচ্ছে সারা পৃথিবীর কওমি মাদ্রাসার প্রধান কেন্দ্র। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের কওমি মাদ্রাসার যত শিক্ষক এবং ছাত্ররা আছে তারা সবাই ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসারই অনুসারী। কওমি মাদ্রাসা আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে কোন ভূগোল নেই, বিজ্ঞান নেই, গণিত নেই, ইংরেজিও নেই। এখানে আছে কেবল ইসলাম আর ইসলাম। ইসলামের জিহাদের পদ্ধতি, অমুসলিমদের হত্যা করার পদ্ধতি, অমুসলিমদের মেয়েদেরকে গনিমতের মাল বানিয়ে তাদেরকে ধর্ষণ করার পদ্ধতি ইত্যাদি কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষাদান করা হয়। আমিও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। যেহেতু কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি সেহেতু কিভাবে অমুসলিমদেরকে মুসলমান বানাতে হয়, মুসলমান না হলে কিভাবে অমুসলিমদেরকে হত্যা করতে হয়, কিভাবে অমুসলিমদের নারীদেরকে গনিমতের মাল বানিয়ে তাদেরকে বিছানায় নিয়ে যেতে হয়, কিভাবে অমুসলিমদের ধনসম্পদ গনিমতের মাল হিসেবে জোর করে নিয়ে নিতে হয় সেসব কিছু আমি থিওরিক্যালি শিখেছি এবং পড়েছি আমার পাঠ্যপুস্তকেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এসব পাঠ্যপুস্তক কিন্তু ভারতের দারুল উলুম মাদ্রাসায়ও পড়ানো হয়! ভারতের দারুল উলুম মাদ্রাসা সহ ভারতে থাকা লক্ষাধিক কওমি মাদ্রাসার মধ্যে এসব কিছুই শেখানো হয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই যে, কওমি মাদ্রাসার এত বর্বরতা বা শিক্ষাব্যবস্থার এমন জঘন্যতা নিয়ে ভারতের সুশীল সমাজে কোন আলোচনা হয় না। এমনকি বাংলাদেশের সুশীল সমাজেও এটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। আমাদের সমাজপতিরা এক ধরনের লেয়ার তৈরি করে রাখে যেখানে আপার কাস্ট এবং লোয়ার কাস্টের মানুষেরা পৃথকভাবে বসবাস করে। আপার কাস্টের মানুষেরা নাটক বানায়, সিনেমা বানায়, ব্যবসা করে, রাজনীতি করে, চাকরি করে। আর লোয়ার কাস্টের মানুষেরা মসজিদের ইমাম হয়, মাদ্রাসার শিক্ষক হয়, জিহাদিদের নেতা হয় এবং সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামিক ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ছড়িয়ে পয়সা রোজগার করে। আপনি যদি একজন ভারতীয় হন এবং বাংলাদেশে যান এবং বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা বুদ্ধিজীবীর সাথে কথা বলেন তাহলে মনে হবে, তিনি যথেষ্টই প্রগতিশীল একজন মানুষ। আপনার মনে হতে থাকবে, ইসলামী মৌলবাদীদের সাথে এই ভদ্রলোকের দূরতম কোন যোগাযোগও নেই। এই যে আপনার মনে হবে এটাই হচ্ছে আমাদের ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ। সত্যি বলতে, এই ভদ্রলোকেরাই ইসলামী জঙ্গিবাদের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। মাদ্রাসার হুজুররা, মসজিদের ইমামরা এবং জিহাদি নেতারা এদের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা নিয়েই চলে। এই ভদ্রলোকদের কাজ হচ্ছে ইসলামী সন্ত্রাসবাদীদেরকে ডিফেন্ড করা এবং তাদেরকে সমাজের মূলস্রোত থেকে দূরে রেখে এক ধরনের জিহাদি উন্মাদনা সমাজে জিইয়ে রাখা। আবার এই কথাও ঠিক, ইসলামের জঙ্গিদেরকে বা মৌলবাদীদেরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি দখল করার সুযোগ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জিহাদের পৃষ্ঠপোষক স্যারেরাও কিন্তু দেবেন না। তিনি এটি হতে দেবেন না, কারণ এটি হলে তাঁর চাকরি চলে যাবে, তাঁর মুখে দাড়ি রাখতে হবে, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যাদেরকে বোরকা পরতে হবে। সুতরাং সমাজের একটি নির্দিষ্ট লেয়ার পর্যন্ত ইসলামিক জিহাদকে প্রমোট করা, ইসলামিক জিহাদিদেরকে লালনপালন করা এটা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কথিত প্রগতিশীল শিক্ষকরাই করেই থাকেন। যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজব্যবস্থা এভাবেই চলে আসছে। আমি জানিনা মাদ্রাসা নামক কারাগার যেখানে লাখ লাখ শিশুদের বন্দি করে তাদের প্রত্যেককেই মাসুদ আজহার, হাফিজ সাঈদ এবং আজমল আমি কাসাবের মতো জঙ্গি বানানোর চেষ্টা চলছে সেটি বন্ধ হবে কিনা। নিজের মনের মধ্যে অন্যের প্রতি হিংসা এবং ঘৃণা জমা করে করে রাখা বড্ড যন্ত্রণাদায়ক। আমি নিজেও এমন যন্ত্রণার ভুক্তভোগী ছিলাম। ঢাকার একটি মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হওয়া সত্ত্বেও যখন ইসলাম ত্যাগ করেছিলাম তখন এত বেশি পরিমাণে জিহাদিদের দ্বারা খুনের হুমকি পাচ্ছিলাম যে, শেষমেশ আমার মাতৃভূমি আমাকে ছাড়তেই হলো এবং বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী কোন একটি রাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে হলো। পুরো বাংলাদেশ যে অন্ধকারে ডুবে গেছে ব্যাপারটা তাও না। আমার মতো আরও অনেক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণকারী মানুষই আছেন যারা ইসলাম ত্যাগ করেছেন এবং প্রাণসংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। পরিশেষে এটুকু বলব, প্রিয় বন্ধু এবং লেখক অধ্যাপক কৌশিক গাঙ্গুলির সকল পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা যেন সফল হয়। বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদ যেন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মানুষ এবং মানবতা যেন বিজয়ী হয়। আমরা যে ভারতের অখন্ড ভারতের মানুষ ছিলাম সেই অখন্ড ভারতই যেন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।