Mufti Masud
একটি গল্প বলি শুনুন। আমার একজন আত্মীয়, তিনি মোটামুটি ভালো গান গাইতেন। মফস্বলের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাকে গান গাওয়ার জন্য ডাকা হতো। হ্যাঁ, তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের কোনো শিল্পী ছিলেন না। তিনি ছিলেন উপজেলা পর্যায়ের একজন শিল্পী। একদিন সেই ভদ্রলোকের সাথে আমার আলাপচারিতা হচ্ছিল। আমি তখন ছিলাম বাংলাদেশের একটি মসজিদের ইমাম। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আমি শিক্ষাগতভাবে হাফেজ মাওলানা এবং মুফতি। হাফেজ বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যে সম্পূর্ণ কোরআন (আরবি ভাষায় রচিত) মুখস্ত করে। আর মাওলানাকে বলা যায় ইসলামি শিক্ষার উপর মাস্টার্সের সমমান একটা ডিগ্রি। আর মুফতি বলা হয় ইসলামী শরিয়া শরিয়া আইনের একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে। আমার সেই আত্মীয় যিনি কণ্ঠশিল্পী, তিনি আমাকে বিভিন্ন গান শোনাচ্ছিলেন খালি গলায়। গান শোনাচ্ছিলেন আর তিনি বিভিন্ন জায়গায় যে স্টেজে গান গাইতে গিয়েছিলেন সে সবকিছু বলছিলেন। আমি তাকে বললাম, গান তো আমারও পছন্দ। রুনা লায়লার গান এবং লতা মঙ্গেশকরের গান খুব পছন্দ করি। তিনি খুব অবাক হয়ে বললেন, আপনি হুজুর মানুষ, আপনি কোন গান শোনেন? এটা কেমন কথা?
আমাদের সমাজের মডারেট মুসলমানেরা এরকমই হয়। বাংলাদেশ বাংলাদেশ যেহেতু সম্পূর্ণ তালেবানি রাষ্ট্র হয়ে যায়নি সুতরাং বাংলাদেশের নাট্যকারেরা এখনও নাটক বানায়, সিনেমার পরিচালকরা সিনেমা নির্মাণ করে এবং মাঝে মাঝে ওপেন এয়ার কনসার্টও হয়। এসবের পাশাপাশি যাত্রাপালা হয়, টিভিতে গানের অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু আপনারা শুনলে অবাক হবেন, বাংলাদেশের যারা সিনেমার পরিচালক তারা কিন্তু মাদ্রাসার হুজুরদের জন্য সিনেমা বানায় না। তারা মনে করে, তাদের সিনেমা অন্য মুসলিমরা দেখুক, কিন্তু মাদ্রাসার হুজুররা না দেখুক। একই কথা অন্য সকল সৃষ্টিশীল পেশার সাথে জড়িত মুসলমানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে হ্যাঁ, খুবই অল্প সংখ্যক কিছু মানুষ আছে যারা সত্যিই প্রগতিশীল, কিন্তু এসব প্রগতিশীলদেরকে বাংলাদেশের সমাজে অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখা হয়। তাদেরকে নাস্তিক হিসেবে ট্যাগ দেয়া হয়। আর নাস্তিক হিসেবে ট্যাগ দিতে পারলে এসব ব্যক্তিবর্গের উপরে যেকোনো ধরনের জিহাদী হামলার সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতাও চলে আসে।
যেহেতু আমি পড়াশোনা করেছি কওমি মাদ্রাসায় এবং প্রায় ১২ বছর আমি মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে কাজও করেছি সুতরাং ইসলামের বিন্দুবিসর্গ সম্পর্কে আমি যে কিছুটা হলেও জানি সেটা দাবি করতে পারি। যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করে, “ইসলাম নামের এই ধর্মটা কি দিয়ে গঠিত হয়েছে?” আমি তাহলে দুটি উপাদানের কথা বলব। একটির নাম ঘৃণা, আর অন্যটির নাম রক্তপাত। ইসলামের ঘৃণায় কেবলমাত্র অমুসলিমরাই আক্রান্ত হয় তা না, এই ঘৃণা এত ভয়াবহ যে, এটিতে আক্রান্ত হয় মুসলিমরাও। মুসলিমরা কেবল অমুসলিমদের গির্জা, মন্দির, প্যাগোডা এবং সিনাগগে আক্রমণ চালায় তা না। তারা আক্রমণ চালায় মসজিদেও। মসজিদেও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয় এবং এসব আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু হয়।