Mufti Masud
একজন মুসলিম বোন। পড়ালেখায় ভালো। ঈমান, আকিদা ও দ্বীনদারিতায় অনবদ্য। ইসলামী ছাত্রশিবিরের রোকন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছে সম্প্রতি। বোনটিকে একদিন বিশেষ একটি জায়গায় ডাকা হলো। ডেকেছেন দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। টেলিফোনে বোনটিকে বলা হয়েছিল : “তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিন হতে চলেছে আজ। দলের কেন্দ্রীয় আমির সাহেব আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাকে দ্বীনের বিশেষ একটি খেদমত আঞ্জাম দেয়ার দায়িত্ব দিতে। তুমি জানোনা কত বড় সৌভাগ্যবতী হতে চলেছ তুমি। সৌদি আরব থেকে একজন শায়খ এসেছেন। শায়খের নামটা এখনই বলছি না। শায়খ বাঙালি, কিন্তু সৌদি আরবের ইসলামিক দাওয়াহ ও গবেষণা বিভাগের উচ্চপদে কর্মরত। আমাদের দলের তিনি প্রধান উপদেষ্টা।”
দ্বীনি বোনটি আল্লাহর উপরে ভরসা করে, দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে বেরিয়ে পড়ল নির্দেশিত গন্তব্যে।
সৌদি শায়খকে দেখে বোনটি মুগ্ধ হয়ে গেল। মানুষ এত সুন্দর হতে পারে! চেহারা থেকে নূর যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। কি সুন্দর সফেদ দাড়ি! মাথার সাদা পাগড়ি থেকে যেন হেরার জ্যোতি বিকিরিত হচ্ছে! তুর পাহাড়ে মুসা নবীর সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ সময়ে যেমন আলো চমকাচ্ছিল শায়খের নুরানী দাঁত থেকেও যেন তেমনি আলো চমকাচ্ছে! আর শরীর থেকে বের হওয়া আতরের ঘ্রাণ! সে কি বলতে? মনে হয় যেন জান্নাতুল ফিরদাউসের সুগন্ধি বের হচ্ছে শায়খের নূরানী জিসম মোবারক থেকে!
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শায়খের সাথে দ্বীনি বোনের পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় পর্বের পর শায়খ কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতিকে বললেন : “ব্যাপারটা তোমাকেও জানানো উচিত হবে না। ব্যাপারটা কেবল তোমাদের কেন্দ্রীয় আমির সাহেব আর আমিই জানি। তোমাকে চলে যেতে বলছি এজন্য তুমি কিছু মনে করো না”
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বললেন : না না, কিছু মনে করব কেন শায়খ? এই যে একনজর আপনাকে দেখলাম এটা তো আমার পরম নসিব। হয়তো এটাই আমার পরকালে নাজাতের উসিলা হবে। শায়খের ডানহাতে চুমু খেয়ে তাঁর কাছ থেকে দোয়া নিয়ে চলে গেলেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি।
দ্বীনি বোনের হৃদস্পন্দন ঘন হচ্ছে। সে শায়খের জাবালে নূরের সমান উচ্চতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে যেন আটকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য শায়খ তাঁর কাছে থাকা কেটলি থেকে চা বানিয়ে পরিবেশন করলেন। নিজের হাতে চা বানালেন। দ্বীনি বোন রীতিমতো পেরেশান – এ কি অবস্থা? শায়খের সাথে গোস্তাখি হয়ে যাচ্ছে যে! শায়খ আপনি বসুন আমি চা বানাই। শায়খ বললেন : না, তুমি বস। দ্বীনি বোনের আর সাহস হল না শায়খের কথা অমান্য করার। চা খেতে খেতে শায়খ বললেন : আজকে তোমাকে অনেক অনেক বড় একটি দায়িত্ব দেয়া হবে, আর সেজন্যই তোমার উচিত আমার সাথে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলা। বিচলিত হলে বা ঘাবড়ে গেলে চলবে না।
চা-বিস্কুটের পর্ব সেরে সৌদি শায়খ দ্বীনি বোনটিকে বললেন : তুমি কি পিনুকে চেনো? বোনটি বললেন, জি না শায়খ। শায়খ বললেন পিনু মেধাবি একটি ছেলে। তাঁর সম্পর্কে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। সে অনেকটা বাম ঘরানার। মনোভাবে সে অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু, মুসলিম কাউকে সে আলাদা করে দেখেনা। সে নিজের সম্প্রদায় হিন্দুদের চেয়ে বরং মুসলিমদের একটু বেশিই ভালোবাসে। সে অসাম্প্রদায়িক হলেও ভারতবিরোধী, আর এই ভারতবিরোধী মনোভাবটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। ওর মধ্যে থাকা এই পুঁজিটাকেই কাজে লাগাতে হবে আমাদের। ওকে আমাদের দলে নিতে হবে, কিন্তু এটা বিশাল এক ঈমানী দায়িত্ব। এ দায়িত্ব তোমাকে দিতে চাই, কারণ সবার মধ্য থেকে শিক্ষা-দীক্ষায় এবং যোগ্যতায় তোমাকেই আমরা সবচে বেহতর মনে করি। কথোপকথন কিছুক্ষণ নয়, বরং অনেকক্ষণ ধরেই বললেন শায়খ। সবকিছু বুঝিয়ে বললেন।
হঠাৎ দ্বীনি বোন প্রশ্ন করে বসল : কিন্তু তাই বলে আমি হিন্দুর স্ত্রী হব?
শায়খ : না, প্রথম কিছুদিন তুমি তাঁর স্ত্রী হবে এবং প্রথম যে কয়দিন তোমার সাথে তাঁর মেলামেশা হবে যদিও সেটা জেনা (ব্যভিচার) হবে কিন্তু এই কয়দিনের মধ্যে তুমি আল্লাহর উপর ভরসা করে গোপনে গোপনে তাঁকে মুসলিম বানিয়ে ফেলবে। মুসলিম হওয়ার পর ইসলামিক রীতি অনুযায়ী তাঁর সাথে তোমার পুনরায় বিয়ে দেব। এরপর তো আর সমস্যা নেই?
দ্বীনি বোনটি : তাই বলে আমি হিন্দুর সাথে সংসার করব? তার সাথে সহবাস করব?
শায়খ : ইসলাম এখন ইসলাম অত্যন্ত বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে। সুতরাং আমাদের বেশকিছু কামেল ঈমানওয়ালা নারীকর্মী লাগবে যাদেরকে আমরা এরকম অসাম্প্রদায়িক বা হিন্দুদের স্ত্রী বানিয়ে দেব। ইসলাম প্রতিষ্ঠার বৃহত্তম স্বার্থ হাসিল করার জন্য সামান্য একটু জেনা করার গুনাহ আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। দলের হাইকমান্ড থেকে তোমাকেই পছন্দ করা হয়েছে। এটা তোমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় রহমত।
দ্বীনি বোনটি : ঠিক আছে শায়খ, কিন্তু একটা কথা আছে। সে হিন্দু, তাঁর তো সুন্নতে খতনা নেই! শায়খ : শোনো স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামেরও সুন্নতে খতনা ছিলনা। তাছাড়া সুন্নতে খতনা যে বয়সে করতে হয় তোমার হবু স্বামীর সে বয়স নেই। সে টগবগে যুবক। বেশি প্রশ্ন না করে এখন তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো।
দ্বীনি বোন : কিন্তু শায়খ, সে যতদিন হিন্দু থাকবে ততদিন যদি আমাকে আমাকে বেপর্দার সাথে চলাফেরা করায়? সে যদি আমার সাথে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে? সে যদি তাঁর বন্ধুদের সাথে আমাকে পরিচিত করায় যা পর্দার বরখেলাপ, তাহলে?
শায়খ : এটা হবে না। তাঁর বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। তাঁর দ্বারা ইসলামের অনেক অনেক অনেক বেশি খেদমত নেয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। সে তোমাকে বেপর্দা রাখবে না। সে হিন্দু নাম ধারণ করেই ইসলামের খেদমত করবে আমরা সেই ব্যবস্থাই করছি আলহামদুলিল্লাহ। সে যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করতে চায় তাহলে সে নিজের ছবিই পোস্ট করবে। ব্যায়াম করে বডি বানিয়ে সেই বডি অনলাইনে দেখিয়ে বেড়াবে। তোমার কোন ছবি সে কোথাও পোস্ট করবে না – গ্যারান্টি! তুমি এখন আর কোন কথা না বলে তোমার দ্বীনি খেদমতের জন্য প্রস্তুত হও। তাঁর সাথে প্রেম করো। তাঁকে বিয়ে করো।
আর হ্যাঁ, অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তবে তা যেন গোপনে হয়। কোনভাবেই ব্যাপারটা প্রকাশ্যে আনা যাবেনা। সে তাঁর হিন্দু নাম নিয়েই সবখানে পরিচিত হবে। তাঁর ইসলামিক নামটা কেবল তুমি একাই জানবে, এমনকি আমরাও জানব না। ইসলামের ভাষায় এটাকেই বলে হেকমত।
কয়েক বছর পর শায়খের সাথে দ্বীনি বোনটির দেখা। শায়খের মুখ হাস্যোজ্জল। দ্বীনি বোনের মুখেও হাসি।
শায়খ : কি, বলেছিলাম না? মুমিনের ফেরাসাত (অন্তর্দৃষ্টি) ভুল হয় না।
দ্বীনি বোনটি : আলহামদুলিল্লাহ, তিনি কালেমা পড়ে মুসলমান হয়েছেন সে খবর শায়খ শুনেছেন নিশ্চয়ই? তাছাড়া তিনি এখন তাঁর বাকি জীবন ইসলামের জন্য কোরবান করে দিতে চান।
শায়খ : সবকিছু ঠিক আছে, কিন্তু সে যদি ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করে তবে তাঁর দ্বারা ফায়দা বেশি হবেনা। বরং সে যদি তাঁর হিন্দু নাম ধারণ করে থাকে, হিন্দু হিসেবে পরিচিত থেকেই যদি ইসলামের পক্ষে কথা বলে, হিন্দু হয়েও সে যদি আমাদের জামাই জিহাদে ইসলাম পার্টির পক্ষে ভূমিকা রাখে সেটি অনেক বেশি কার্যকরী। অদূর ভবিষ্যতে আমরা কওমি মাদ্রাসার হুজুরদের দিয়ে যে দলটি তৈরি করব “হেফাগোটে ইসলাম” নামে, সেই দলটির পুনর্গঠন, জিহাদ পরিচালনা এসব কিছুই আমরা তাঁকে দিয়েই করাতে পারব ইনশাআল্লাহ।
এবার শায়খ একটু থামলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি দ্বীনি বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি হেসে বললেন : দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেককেই প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে এমনটা হেকমতের দাবি না।
দ্বীনি বোনটি : কিন্তু শায়খ, সে কিন্তু মাঝেমাঝেই আপসেট হয়ে যায়। সে বলে, কেন আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি সেকথা বলতে পারব না? আমি কি হিন্দু দেশে বসবাস করি যে, আমি আমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারব না?
শায়খ : দেখ, এটাই তো খেলা। তাঁর এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। তাঁকে বলতে হবে, চারিদিকে ইসলামের দুশমনেরা বসে আছে, পুরো বাংলাদেশে নাস্তিকেরা ফাঁদ পেতে আছে আর এজন্যই তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ্যে আনা যাবেনা। তাঁর মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার হবে, যে ক্রোধের সঞ্চার হবে সেটাকেই আমরা আমাদের ইসলামের পক্ষে ব্যবহার করব। হিন্দু নাম ধারণ করতে বাধ্য হওয়ার দুঃখে সে ইসলামের পক্ষে এত বেশি ভূমিকা রাখবে যেটা অন্য কোন মুসলিমও পারবে না।
কিছুক্ষণ থেমে শায়খ আবার বললেন : গতকাল সৌদি আরবের শায়খ হাসান আল জাহরানির সাথে আমি কথা বলেছি। মুসলিম ব্রাদারহুডের শায়খ বাকি আল কাহতানির সাথেও আমার কথা হয়েছে। তাঁরা সবাই আমাদের এই পরিকল্পনার খুব প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশে এভাবেই ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার অনেক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
শায়খ এবার বললেন, তুমি কি জানো পিনু সম্পর্কে কবে থেকে আমরা কনসার্ন?
দ্বীনি বোনটি : জি না শায়খ।
শায়খ : ভারতের একটি সম্মেলনে একজন ইসলামপন্থী নেতার সাথে বহুদিন আগে পিনুর আলাপ হয়েছিল। পিনু সেখানে গিয়ে ভারতের বামপন্থীদের সাথে মেলামেশা করলেও আমাদের জামাই জিহাদে ইসলাম পার্টি ইন্ডিয়ার একজন সদস্য বামেদের সাথে মিলে গিয়ে পিনুর সাথে দীর্ঘক্ষণ ইসলাম ও সমাজতন্ত্র নিয়ে আলাপ করেছে। সে পিনুকে ইসলামের সৌন্দর্য বুঝিয়েছে। তাঁর কাছ থেকে তথ্য পেয়ে আমরা পিনুর পেছনে আমাদের লোক লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সৌদি আরব, কাতার, মিশর, পাকিস্তান এবং তুরস্কের শায়খগণ এ বিষয়টা নিয়ে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা সবাই চেয়েছেন, বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় পিনুকে যেন কাজে লাগানো হয়। আর তারজন্য একজন দ্বীনি বোনের সাথে পিনুর প্রেম এবং বিয়ে যেন ঘটিয়ে দেয়া হয়। আজকের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তোমার। আল্লাহ তোমার এই খেদমতকে কবুল করুন। তোমাকে আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন – আমীন।
দ্বীনি বোনটিও পাঠ করল – আমীন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : বাংলাদেশের এই দ্বীনি বোনের আত্মত্যাগ বৃথা হয়ে যায়নি।