আজ এমন একজন মানুষের জন্মদিন যিনি শুধু আলো ছড়িয়েছেন। তিনি ছড়িয়েছেন ভালোবাসা, ছড়িয়েছেন অসাম্প্রদায়িকতা, ছড়িয়েছেন মুক্তচিন্তা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা। তিনি আমাদের সবার প্রিয় তসলিমা নাসরিন।
ও আচ্ছা, আমি সবার প্রিয় কেন বলছি? তিনি কি সকলের প্রিয়? আমি সাধারণত মানুষের প্রশংসা কম করি। মানুষের প্রশংসা কম করি বলে আমার বদনামও আছে। আমি তেল মারা পছন্দ করি না। জীবনে যতবার বিপদে পড়েছি বা যত বিপদে পড়েছি তার মধ্যে এক নাম্বার কারণ যদি কিছু থাকে সেটি হচ্ছে তেল মারা। অনেকে তেল মেরে সুবিধা আদায় করে। আমি তেল না মারার কারণে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছি সারাজীবন, সব সময়। তসলিমা নাসরিনকে আমি যতটা ভালোবাসি ততটা প্রকাশ করি না। কারণ কেউ আবার তেল মারা মনে করতে পারে। কিন্তু আজ কেউ আমাকে তেলবাজ বলুক বা না বলুক তাতে কিছু যায় আসে না। সত্য যে আমাকে বলতেই হবে।

শুরুটা হয়েছিল ঘৃণা দিয়ে। আমি যখন খুব ছোট, খুবই ছোট, তখন ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে মিছিলে গিয়েছিলাম। সাথে ছিলেন আমার বাবা। বাবার হাত ধরে মিছিলে গিয়েছিলাম। সেখানে উচ্চারিত হয়েছিল, “মুরতাদ তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চাই।” সে সময় ‘নাস্তিক’ শব্দটা উচ্চারিত হতো না বাংলাদেশে। হলেও খুব কম। তখন ইসলামত্যাগী ব্যক্তিদেরকে ‘মুরতাদ’ বলা হতো। পরবর্তীতে অবশ্য মডারেট মুসলিমদের সাথে মিলেমিশে মোটামুটি অনেক ‘বাক্যকৌশল’ হুজুররাও শিখে গেছে। যেমন, আগে বলতো, রাসূলকে গালি দিলে তাকে হত্যা করতে হবে। এখন বলা হয়, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দিলে শাস্তি দিতে হবে।
আমি যতদিন মাদ্রাসায় পড়েছি, কোনদিনই ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’—এমন কোন টার্ম বা এমন কোন শব্দ কোন হুজুরের মুখে শুনিনি। আমার শিক্ষকদের মুখে তো ভুলেও শুনিনি। কিন্তু এখন আমাদের দেশের মুসলমান সাংবাদিক, মুসলমান ব্যবসায়ী, মুসলমান সাহিত্যিক এবং মুসলমান কবিরা হুজুরদেরকে পরিভাষা শিখিয়ে দিয়েছে। হুজুররাও এখন ওদের মতো ‘ধর্মীয় অবমাননা’ শব্দটা ব্যবহার করে, সরাসরি ইসলামের নাম সহজে নেয় না। মডারেট মুসলমানেরা ‘মুরতাদ’ টার্ম ইউজ করে কম, কারণ ওটা আরবি শব্দ। ওরা যতটা সম্ভব বাংলা শব্দ বা ইংলিশ শব্দ ব্যবহার করে, আর সেজন্যই এখন ওরা বলে ‘নাস্তিক’। ওরাই হুজুরদেরকে শিখিয়েছে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ টার্মটা। ইসলামে কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলতে কিছু নেই। কারণ, ইসলামে অন্য ধর্মকে আঘাত করেই কথা বলতে বলা হয়েছে। অন্য ধর্মকে আক্রমণ করতেই বলা হয়েছে। অনুভূতি-টনুভূতির কোন বালাই সেখানে নেই।
সেই তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণা করা এবং তার ফাঁসি চাওয়া থেকে শুরু। তারপরে মাদ্রাসায় যত পড়েছি, হুজুরদের কাছে সবসময় তসলিমা নাসরিনের বদনামটাই শুনেছি। এবং হুজুররা কিভাবে তাকে গনিমতের মাল হিসেবে পেতে পারে বা গনিমতের মাল হিসেবে কল্পনা করে কত রকমের বাক্য যে আমাদেরকে বলেছে, সেটি ভাবলে আজ এখন পর্যন্ত আমি হুজুরদের মানসিক বৈকল্য এবং চিন্তার শূন্যতা অনুভব করি। তাদেরকে ঘৃণা করতে ইচ্ছা হয় না, বরং মায়া লাগে। এই মানুষগুলো তো মানুষ হিসেবেই জন্মগ্রহণ করেছিল। কিন্তু এত ঘৃণা তাদের মধ্যে কে ঢেলে দিয়েছে? কে তাদেরকে এত ঘৃণা শিখিয়েছে? কে তাদেরকে এত নোংরা, এত হিংস্র, এত পাশবিক, এত অমানবিক বানিয়েছে? কে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর কবে আমরা খুঁজে পাবো, আমিও জানি না।
যেটা বলছিলাম, তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণার কথা আমি আমার প্রায় সমস্ত শিক্ষকের মুখেই শুনেছি। এ কথা সত্য যে, আমার শিক্ষকদের মধ্যে যারা নাস্তিক ছিলেন, তারাও বাস্তবতার প্রয়োজনে কিংবা অন্যদের সাথে তাল মেলাবার জন্য হলেও দু-একবার তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু পাশাপাশি আমি এটাও খেয়াল করেছি, আমার শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা ধর্ষক ছিলেন না, যাঁরা বিকৃত রুচির ছিলেন না বা যাঁরা ইসলামের গণ্ডিতে আটকে থাকার কারণে হাঁসফাঁস করছিলেন—তাঁদের মুখে কিন্তু আমি তসলিমা নাসরিনের বদনাম শুনিনি। আর যদিও বা তারা বলে থাকেন, সেটা স্রেফ অন্যদের সাথে তাল মেলানোর জন্য।

যারা তসলিমাকে ঘৃণা করে, তাদের সবার চরিত্রের মধ্যেই মামুনুল হক কিংবা গাজী নজরুল ইসলামের মতো ব্যাপার-স্যাপার আমি দেখেছি। সব তসলিমা-বিদ্বেষীদের মধ্যেই আমি ছোটখাটো মোহাম্মদকে (চরিত্রহীন) খুঁজে পেয়েছি। এমনকি এই যে আমি তসলিমা নাসরিনের প্রশংসা করে বা তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখছি, আমি জানি এই লেখাটার কারণে কিছু কিছু মানুষের গাত্রদাহ হবে। তারা হয়তো প্রকাশ্যে কমেন্টে কিছু বলবে না, কারণ তারা নিজেদেরকে নাস্তিক, মুক্তমনা, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক—এরকম হরেক রকমের লেবেলে দাবি করে। কিন্তু আসলে তাদের ভেতরে বসবাস করে একেকটা মামুনুল হক, তাদের ভেতরে বাস করে একেকটা গাজী নজরুল ইসলাম, তাদের ভেতরে বাস করে একেকটা ‘পিচ্চি মোহাম্মদ’। এজন্যই তারা প্রকাশ্যে কথাগুলো বলতে পারে না। যে কথা প্রকাশ্যে বলার সাহস নেই, সে কথা তারা পেছনে পেছনে বলে। কখনো ইনবক্সে, কখনোবা ফোন করে।
ছোটবেলা থেকেই আমি একটা বিষয় দেখে আসছি এবং এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি স্পষ্ট—যারা তসলিমা নাসরিনের বদনাম করে, তাদের সবার চরিত্র ইসলামের নবী মোহাম্মদের কাছাকাছি। অবশ্য মোহাম্মদের মতো চরিত্রহীন হওয়া এ যুগে কারো পক্ষেই সম্ভব না। যেহেতু মোহাম্মদের মতো চরিত্রহীন হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব না, তাই আমি ‘কাছাকাছি’ বলেছি।
সত্যি বলতে, আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে যে, আমাদের জীবনযাপনের গাইডেন্স কী হওয়া উচিত বা কোন গাইডিং প্রিন্সিপালকে সামনে রেখে আমরা জীবনযাপন করব, তাহলে আমি সোজাসুজি উত্তর দিই—মোহাম্মদ। মোহাম্মদকেই আপনার গাইডিং প্রিন্সিপাল হিসেবে রাখতে পারেন। মোহাম্মদের জীবনটা পাঠ করুন। মোহাম্মদ ধর্মের নামে যা কিছু করেছে, আপনি যদি সিদ্ধান্ত নেন যে এর কোনোটিই আপনি করবেন না, তাহলে আপনি শুধু একজন মানুষ নন, আপনি একজন মহান মানুষে পরিণত হবেন।
আর তসলিমা নাসরিন তার জীবনে যা কিছু করেছেন, সেটা নিয়ে আমি আপনাদের বলছি না যে, মুসলমানরা যেভাবে তাদের নবীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, সেভাবে তাকেও বিশ্বাস করতে হবে। এমনকি আমাকেও অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে বলছি না। কারণ, আমরা সবসময়ই যৌক্তিক সমালোচনা পছন্দ করি।

আমি নারীকে ঘৃণা করতে শিখিনি। শিখিনি, কারণ আমি জীবনে কোনো খারাপ নারী পাইনি। আমি এ কথাও বলছি না যে, নারীরা খারাপ হতে পারে না। পুরুষ আর নারী যেহেতু আমার চোখে সমান, সুতরাং নজরুলের ভাষায় বলতে হয়,
“বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।”
যেহেতু আমি সাম্যে বিশ্বাসী, সুতরাং নারীরাও যে দোষ করতে পারে, সেটা আমি মানি। কিন্তু জীবনে প্রথম যে নারীর কোলে আমি উঠেছি, তিনি আমার মা। আমি আমার মাকে একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে পেয়েছি। দ্বিতীয়ত যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তিনি আমার মাসি। মাসিকে মুসলমানরা ‘খালা’ বলে। যেহেতু আমি বাঙালি, সুতরাং আমি বাংলা ভাষায় ‘মাসি’ই বলবো। আমি অন্য ভাষার শব্দ ‘খালা’ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমার মাসিকেও আমি অসাধারণ একজন ভালো মানুষ হিসেবে দেখেছি।
আমি যাকে বিয়ে করেছি, আমার সেই প্রিয় টুনিকে আমি পৃথিবীর সেরা নারী মনে করি। আমি তাকে এতটাই ভালোবাসি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি সারাজীবন তার জন্য অপেক্ষায় থাকতে রাজি আছি। শুধুমাত্র তার জন্য আমি আমার অসংখ্য দিন এবং ক্ষণ গুনতে প্রস্তুত। তার কথা ভেবেই আমি নিজের জীবনে বহু রকম বিধিনিষেধ আরোপ করতে রাজি আছি। ইনফ্যাক্ট, আমি অনেক বিধিনিষেধ নিজের ওপর আরোপও করেছি। এসব বিধিনিষেধের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ না করা। আমি সত্যিই তাকে গভীরভাবে ভালোবাসি। আমি নিজেকে বর কিংবা স্বামী বলি না, আমি নিজেকে টুনির একজন সাচ্চা প্রেমিক বলি। আমি নারীবিদ্বেষী হতে পারিনি বলে মুসলিম হতে পারিনি। আমি নারীবিদ্বেষী কিভাবে হব যেখানে আমি আমার মাকে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি?
সুতরাং, আমার মধ্যে নারীবিদ্বেষ কোনোদিন স্থান পায়নি এবং পাবেও না। কারণ, আমি আমার কাছাকাছি যেসব নারীকে পেয়েছি, তাদের সবাইকে অসাধারণ ভালো মানুষ হিসেবে দেখেছি। এসব নারীর মধ্যে আমার শাশুড়ির কথা বললেও কোনো অত্যুক্তি হবে না। আমার মনে হয়, পৃথিবীর সেরা মানুষগুলোর মধ্যে আমার শাশুড়ি একজন। এত সাদা মনের মানুষ খুব কমই হয়।
আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে যত দেখি তত অবাক হই। তাঁকে দেখলে মনে হয়, যেন আমি অসাধারণ এমন একজন মানুষকে দেখছি, যিনি আলোর মশাল হাতে আলোকবর্তিকা নিয়ে পৃথিবীজুড়ে শুধু আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখিকা, শুভ জন্মদিন আমার অসাধারণ শ্রদ্ধার মানুষটিকে। শত বছর বেঁচে থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং আলোহীন সমাজে এভাবেই আলো ছড়াতে থাকুন।

1 Comment
খুবই চমৎকার অনুভূতি, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার প্রকাশ।