এর মানে কি হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ? তাহলে হাদিসের ভাষ্যে গাজওয়ায়ে হিন্দুস্তান নেই কেন? মোহাম্মদ কি তবে হিন্দুস্তানকে হিন্দ বলেছে? তাহলে কি মোহাম্মদ দেশটার নাম জানত না? আপনি যদি বলেন গাজওয়ায়ে বাংলা, মানে বাংলার সাথে যুদ্ধ, তাহলে এটা দিয়ে আমি কি বুঝব? পূর্ব বাংলা নাকি পশ্চিম বাংলা? নাকি বাংলা ভাষা? নাকি বাংলা সংস্কৃতি? নাকি বাংলাদেশ? নাকি বাঙালি?
এবার আসি অন্য আলাপে। দেশটার নাম তো ভারত, কিন্তু এর নাম হিন্দু কবে হলো? হিন্দু নামে আদৌ কোন দেশের অস্তিত্ব কোনকালে ছিল? মানে, বোঝাতে চাচ্ছি মহাভারত, রামায়ণ, বেদ কিংবা তারও বহু আগের লেখা কোন প্রাচীন বইতে (হোক সে বইয়ের লেখক ভারতীয় কিংবা অন্য কোন দেশের) কি হিন্দু নামে কোন দেশের কথা পাওয়া গেছে?
কথা আরো আছে। গাজওয়ায়ে হিন্দ ফারসি শব্দ। আরবিতে ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ হওয়া সম্ভব না। আরবি ভাষা অনুযায়ী এটা ব্যাকরণসম্মত (নাহু-ছরফ) নয়। ব্যাকরণসম্মত হচ্ছে গাজওয়াতুল হিন্দি অথবা গাজউল হিন্দি (غزوة الهند/غزو الهند)। গাজওয়াতুল হিন্দি শব্দদ্বয় একটা অন্যটার সাথে এজাফতের সম্পর্ক রাখে। সুতরাং মুজাফের শেষে একটা রফা (উ-কার) এবং মুজাফ ইলাইহির শেষে একটা জর (ই-কার) থাকাটাই সঠিক।
তৎকালীন আরবে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই ক্ষেত্রেই একটা নাম রাখার প্রচলন ছিল – আর তা হচ্ছে হিন্দু। আপনাদের হুজুররা আপনাদেরকে বলে নামটা হচ্ছে হিন্দ বা হিন্দা। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নামটা হবে হিন্দু বা আল হিন্দু। মোহাম্মদের প্রথম স্ত্রী খাদিজার পূর্ববর্তী দুটি বিয়ের মাধ্যমে জন্ম নেয়া কয়েকটি সন্তানের মধ্যে দুজনের নাম ছিল হিন্দু। এই দুই সন্তানের মধ্যে একজন ছেলে হিন্দু, এবং একজন মেয়ে হিন্দু। মক্কার কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ানের (মোহাম্মদের শ্বশুরও বটে) স্ত্রীর নাম ছিল হিন্দু। তাহলে মোহাম্মদের নামে চালিয়ে দেয়া যে গাজওয়াতুল হিন্দি সংক্রান্ত হাদিস বা হিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাদিস সেসব কার সম্পর্কে? সেগুলো কি মোহাম্মদের স্ত্রী খাদিজার পূর্ববর্তী বিবাহের সন্তানদের (ছেলে হিন্দু এবং মেয়ে হিন্দু) বিরুদ্ধে নাকি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দুর বিরুদ্ধে?
তারপরে আরো প্রশ্ন আছে:
১) মোহাম্মদ যদি ভারতকেই হিন্দু বলে থাকেন তবে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটা হাদিসেই কেন হিন্দু তথা ভারতের কথা আলোচিত হয়েছে?
২) কেন মোহাম্মদের একজন সাহাবি থেকেও হিন্দু তথা ভারত নিয়ে আর কোন আলোচনা হয়নি? কেন আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, মুয়াবিয়া, এজিদ এদের কারোরই শাসনামলে হিন্দু নামের কোন দেশের আলোচনা সংক্রান্ত কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না? তারা কেউই কি হিন্দু নামের কোন দেশকে চিনত না? মোহাম্মদ হিন্দু নামের একটি দেশের আলোচনা করার পরেও তার সাহাবিরা কেউই কি এই দেশের নাম জানত না? তাদের মধ্যে কি হিন্দু নামের একটি দেশ সম্পর্কে কোন কৌতূহল তৈরি হয়নি?
৩) দেশটির নাম যদি হিন্দু হয় তবে সেটা হিন্দু থেকে হিন্দুস্তান কিভাবে হয়ে গেল? মোহাম্মদ যদি ভারতের নাম বলেন হিন্দু (হিন্দুস্তান নয় কিন্তু!) তাহলে মুসলমানরা কেন হিন্দুস্তান বলে? কেন তারা দেশটার নাম হিন্দু বলে না? মুসলমানরা কেন মোহাম্মদের হুবহু অনুসরণ করে না?
আমার স্টাডি অনুযায়ী, বিষয়টা আসলে এরকম হবে বা এরকম হওয়া উচিত:
১. মুহাম্মদ বিন কাসিমকে যখন ভারতের সিন্ধু এবং মুলতান দখল করার জন্য গিহাদে পাঠানো হয় তখন এই গিহাদি দলকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কিছু হাদিস তৈরি করা হয়। সেসব হাদিসেরই বক্তব্য বা প্রতিপাদ্য হচ্ছে গাজওয়াতুল হিন্দি।
২. যেহেতু ভারত আরব ভূখন্ড থেকে অবস্থানগত কারণে অনেক দূরে ছিল তাই দেশটির সঠিক নাম সম্পর্কে জানতে পারেনি মুসলিম শাসকেরা। যেহেতু সেখানে সিন্ধু নদী রয়েছে আর আরব হানাদাররা হয়তো কোনভাবে স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে সিন্ধুর উচ্চারণটা হিন্দু হিসেবে শুনেছে। অথবা বলা যায়, যেহেতু আরবে হিন্দু নামের লোকেরা ছিল বা এ ধরনের নাম রাখার প্রচলন ছিল তাই সিন্ধু শোনার পরেও তারা সেটাকে হিন্দু মনে করেছে। তখনকার সময়ের শাসকেরা হাদিস নির্মাণকারী তৈরি পুষত। এই হাদিস নির্মাণকারীরা শাসকদের মর্জিমতো বিভিন্ন সময়ে হাদিস তৈরি করত। এটাই ইতিহাস ইসলামের ইতিহাস। মাদ্রাসায় এই ইতিহাস আমরা পড়েছি। আমাদের হুজুররাও স্বীকার করেছেন যে, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীল অনুসারী একদল হুজুর শাসকদের মর্জি মোতাবেক হাদিস তৈরি করত।
৩. পরবর্তীতে যখন মুসলিম হানাদাররা ভারত দখল করেছে তখন দেশটির নাম রেখেছে হিন্দুস্তান (গাজওয়াতুল হিন্দি বা হিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সেই হাদিসের সাথে তাল মিলিয়ে নামটা রাখা হয়েছিল)। এই নাম রাখার পেছনে মূলত উদ্দেশ্য ছিল সেই বানোয়াট হাদিসের সত্যতা প্রমাণের ইসলামিক প্রচেষ্টা।
৪. ভারতে যেসব ইসলামিক হানাদার বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এবং দখলদারিত্ব কায়েম করেছে তারা যখন দেখল যে, আহলে হাদিস (সালাফি) সম্প্রদায়ের মুসলমানরা গাজওয়াতুল হিন্দির হাদিসগুলোকে সহীহ বলে মান্যতা দিচ্ছে না অথচ এই দেশটাকে দখলে রাখতে গেলে তাদের গাজওয়ায়ে হিন্দির হাদিসের খুবই প্রয়োজন তখন তারা সালাফি মতাদর্শের সাথে চরমভাবে বৈরিতাপূর্ণ হানাফি মাযহাবকেই গ্রহণ করল। আর এভাবেই দুর্বল হাদিস এবং জাল হাদিসের ব্যাপারে আপোষকমী আবু হানিফার ধর্ম হানাফি মাযহাব ভারতবর্ষে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। হানাফি মাযহাবের ইসলাম ভারতে প্রথম বড় পরিসরে বিস্তার লাভ করে আওরঙ্গজেবের হাত ধরে, যখন অরঙ্গজেব তার দরবারি আলেমদের দিয়ে ফতোয়ায়ে আলমগীরী নামের একটা হানাফি মাযহাবের ফতোয়াগ্রন্থ লিপিবদ্ধ করালেন। দ্বিতীয়বার হানাফি মাযহাব আবার বড় পরিসরে বিস্তার লাভ করে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
৫. আজকের দিন পর্যন্ত সালাফিরা, অর্থাৎ সৌদি আরবের ইসলামিক স্কলাররা এবং সৌদি আরবের শাসকগোষ্ঠী তারা কেউই কথিত গাজওয়ায়ে হিন্দির হাদিসকে সহীহ বা বিশুদ্ধ বলে মান্যতা দেয় না।
সৌদি আরবের মক্কা, মদিনার ইমাম সহ অন্যান্য স্কলারদের যে ধর্ম অর্থাৎ সালাফি ইসলাম তার সাথে আজকের দিন পর্যন্ত আমাদের ভারতবর্ষের (পুরো দক্ষিণ এশিয়া) মুসলমানদের ধর্মীয় বিভাজনের একটি বড় কারণ কিন্তু গাজওয়াতুল হিন্দি।
তাহলে কি বুঝলেন? গাজওয়াতুল হিন্দি বলতে আসলে কিছু আছে? হিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলতে কিছু থাকতে পারে? হিন্দু নামের কোন দেশ কি পৃথিবীতে এখনো আছে? কোনদিনই কি হিন্দু নামের কোন দেশ ছিল? হিন্দু নাম কি প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় ভারতের কোন মানুষের কখনোই ছিল? হিন্দু নাম তো আরবের লোকদেরই ছিল, তাহলে আরব থেকে কিভাবে হিন্দু নাম ভারতে ঢুকল? ভারতের সনাতন ধর্মের অনুসারীরা নিজেদেরকে হিন্দু দাবি করে কিসের ভিত্তিতে? আরবদের পাতা ফাঁদের মধ্যে পা দেয়ার কারণেই কি? নাকি তারা মোহাম্মদের স্ত্রী খাদিজার প্রথম ঘরের পুত্র এবং কন্যা? নাকি তারা সবাই কি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী? হিন্দু নামটা কিভাবে এলো? কোত্থেকে এলো?
হে ভারতবাসী! ভাবুন। আরও গভীরভাবে ভাবুন।

