তসলিমা নাসরিন

মুফতি মাসুদ রচিত ‘নাস্তিক ইমামের হজ্ব’ বইটির দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক তসলিমা নাসরিন একটি ভূমিকা লিখেছিলেন। সেটিই এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো।
১৯৯৪ সালের কথা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ প্রায় প্রতিটি জেলায়ই ইসলামিক উগ্রবাদীরা আমার বিরুদ্ধে মিছিল করছে। ওদের একটাই দাবি – মুরতাদ তসলিমা নাসরিনকে ফাঁসি দিতে হবে। সে সময়ে আমি খুবই আতঙ্কে থাকতাম, এই বুঝি কোন মোল্লা আমার ঘাড়ে কিংবা মাথায় মাদ্রাসার ধারালো চাপাতি দিয়ে আঘাত করল! আমার বিরুদ্ধে করা সেসব মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল মসজিদের ইমামরা এবং মাদ্রাসার শিক্ষকেরা। ওদের প্রায় কেউই আমার বই পড়েনি। আমি কি লিখেছি সেটি ওরা অন্যদের কাছ থেকে শুনেছে। শুনে শুনেই ওরা ক্ষিপ্ত হয়েছে, আমাকে মুরতাদ ফতোয়া দিয়েছে এবং আমার মৃত্যুদণ্ড চাইছে। তখন আমি ভাবতাম, এই যে মাদ্রাসার এতগুলো শিক্ষক এবং এত এত মসজিদের ইমাম ওদের মধ্যে কি কারোরই শুভবুদ্ধি নেই? ওদের মধ্যে কেউ কি আমার বইটা খুলে একটু পড়তে পারছে না? আমি যা লিখেছি আর ওদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে যা লেখা আছে এই দুয়ের মধ্যে কোনটা নারীর জন্য কল্যাণকর তা কি ওরা একটু যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারছে না? যদি ওদের ধর্মগ্রন্থের চেয়ে আমার কথা ভালো হয় তবে সেটি মেনে নিতে আপত্তি কেন? আর যদি আমার লেখার চেয়ে ওদের ধর্মগ্রন্থের বক্তব্য ভালো হয় তবে আমার ফাঁসি চাইছে কেন? ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখলেই তো পারে! দেশ ছাড়তে হলো। এরপর আমার দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শুরু হলো। বিশ্বের অনেক দেশেই আমি সম্মান পেয়েছি, অনেক পুরষ্কারও পেয়েছি কিন্তু নিজের দেশেই আমি সম্মান পেলাম না। সম্মান পাওয়া তো দূরের কথা, এত বছরের মধ্যে নিজের দেশে ফিরতেও পারিনি আমি। আজও আমি নির্বাসিত।
২০১৭ সালে কিছু বন্ধুর কাছে শুনলাম, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ নামের একজন ইমাম নাকি ইসলাম ত্যাগ করে নাস্তিক হয়ে গেছে। সে হাফেজ মাওলানা এবং মুফতি, অর্থাৎ ইসলামিক শিক্ষায় সে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। সে ঢাকার একটি মসজিদের ইমাম ছিল এবং কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপালও ছিল। আমি সে সময় কৌতুহলবশত তাঁর বেশকিছু স্মৃতিচারণামূলক ব্লগ এবং ফেসবুক পোস্ট পড়েছি। সেসব পড়ে বুঝতে পারলাম, সে যখন ইমাম ছিল তখন কেন সে সত্য কথা বলতে পারেনি সেটি নিয়ে তাঁর বেজায় আক্ষেপ! এখন সে সত্য বলছে। কোরআনে কি লেখা আছে তাই বলছে। হাদিসে কি লেখা আছে তাই বলছে। অন্য মুসলমানদের মতো সুগারকোটিং না করে বরং প্রকৃত ইসলাম বা ইসলামের স্বরূপ কেমন তার সবটাই মুফতি মাসুদ বলছে। সেই যে ১৯৯৪ সালে আমি ভেবেছিলাম যে, এসব মোল্লাদের কারোর মাথায়ই কি শুভবুদ্ধি নেই তার উত্তর আমি বহুবছর পরে পেয়েছি। আমি এই মোল্লাদের মধ্য থেকেই একজনকে পেয়েছি যার মাথায় শুভবুদ্ধি আছে। এরপর মাসুদের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের আরো অনেক ইমামরাই নাকি একটু হলেও অন্যরকম চিন্তা করে। তাঁরা নারীকে ইসলাম যতটা ঘৃণা করতে বলে ততটা ঘৃণা করে না। ইসলাম নারীকে যতটুকু অবদমন করতে বলে তাঁরা ততটা অবদমন করে না বা করতে চায় না। যতটুকু করে ততটুকু নাকি কেবল নিজেদের প্রাণ রক্ষার তাগিদেই করে। ২০১৭-১৮ সালে আমার মনে হতো, মুফতি মাসুদ যে বলছে আরো অনেক ইমাম মনেমনে অবিশ্বাসী এটা কি সত্য হতে পারে? মাসুদ যে বলছে, আরো অসংখ্য ইমাম নারীর প্রতি এবং অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমুলক ধারণা পোষণ করে না এটা কি সত্য হতে পারে? এরপর আমি দেখলাম কিছু মানুষ একটু একটু করে পরিবর্তনের কথা বলছে। যারা মেয়েদের কওমি মাদ্রাসা তথা মহিলা মাদ্রাসায় পড়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে জানিয়েছে যে, আমার লেখা তাদের ভালো লাগে। তাঁরা জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে কিংবা লিখতে পারে না কিন্তু আমার জন্য দূর থেকে তাঁরা শুভকামনা রাখে। আমি আমার জীবনকে যে লক্ষ্যে নিবেদিত করেছি তাঁরা সেই লক্ষ্যের প্রতি একমত পোষণ করে।

‘ইমামের তীর্থযাত্রা’ মূলত আত্মজীবনীমূলক একটি বই। ইমাম থাকা অবস্থায় মুফতি মাসুদ হজ্ব করেছিল। সেই হজ্বের গল্পই অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছে মুফতি মাসুদ। এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, একজন ধর্মগুরুর তীর্থযাত্রা পড়ে আমার কি লাভ? আপনি ইসলামে বিশ্বাসী হন কিংবা অন্য কোন ধর্মে, কিংবা আপনি যদি নাস্তিকও হন তবুও এ বইটি পড়া আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, মুফতি মাসুদের হজ্ব অন্যদের হজ্বের মতো না। মুফতি মাসুদের অভিজ্ঞতা এবং নিরীক্ষণ অন্যদের অভিজ্ঞতা এবং নিরীক্ষণের মতো না। ইসলামের প্রধান তীর্থযাত্রা হজ্ব করার জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লক্ষ মানুষ সৌদি আরবে যায়। সারা বিশ্ব থেকেই মুসলমানরা হজ্ব করতে সৌদি আরবে যায়। তাদের মধ্যে অনেকেই হজ্বের স্মৃতি নিয়ে বই লিখেছে। এখনো অনেকে লিখছে। মুফতি মাসুদের বই তাদের বইয়ের মতো না, কারণ মুফতি মাসুদ যখন হজ্ব করেছে তখন সে মসজিদের ইমাম ছিল একথা সত্য, কিন্তু একইসাথে সে ইসলামে অবিশ্বাসীও ছিল।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিষ্কৃত হয়েছে। তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর ইসলামের প্রচার এবং প্রসারে আরো একবার জোয়ার এসেছিল। সৌদি আরব সহ উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশের রাজারা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, দল এবং গোষ্ঠীকে তেল বিক্রির টাকা দিয়ে ইসলামের প্রচার করিয়েছে। কিন্তু সেই সৌদি আরব এখন বদলে যাচ্ছে। সৌদির শাসকেরা এখন ইসলাম প্রচারে আগের মতো ফান্ডিং করছে না। তাদের দেশের মেয়েরা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছে। সৌদি আরবে এখন সিনেমা তৈরি হচ্ছে, কনসার্ট হচ্ছে এবং এমন অনেক কিছুই হচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যেত না। সৌদি আরব বদলালেও আমার বাংলাদেশ যেন বদলাচ্ছে না। বদলাচ্ছে না ঠিক তা বলব না, বরং নেতিবাচক দিকেই আমার দেশ বদলাচ্ছে। সৌদি আরব ছুটছে সামনের দিকে আর বাংলাদেশ ছুটছে পেছনের দিকে। বাংলাদেশের অশিক্ষিত মুসলমানরা এবং তাদের পরিচালনাকারী শিক্ষিত মুসলমানরা উভয়েই যেন পাল্লা দিয়ে ছুটতে চাইছে চৌদ্দশ বছর আগের এক পৃথিবীতে। সৌদির রাজপরিবার এবং ধনীদের কাছে ধর্ম এখন আর গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না। তবে হজ্ব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হজ্ব থেকে ওদের প্রত্যক্ষ আয় হয় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। আর অপ্রত্যক্ষ ইনকাম এরচেয়েও কয়েক গুণ বেশি। বিনা পুঁজিতে ব্যবসা যদি কারো হয় তবে সে কি সেটি সহজে ছাড়তে চাইবে? চাইবে না। সৌদি আরব যদিও এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে কিন্তু তাদের হজ্ব-ব্যবসা সহসা বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। তবুও সৌদি আরব এগিয়ে যেতে থাকুক। এগোতে এগোতে যদি তাদের কোনদিন মনে হয় এই ভন্ডামি বন্ধ করা দরকার তাহলে তারা হয়তো সেটা করবে। ঠিক যেভাবে মুফতি মাসুদ তাঁর ধর্মব্যবসা বন্ধ করেছে সেভাবে সৌদিও হয়তো কোনদিন তাদের হজ্ব-ব্যবসার ইতি টেনে দেবে। মুফতি মাসুদের সুন্দর একটা ক্যারিয়ার ছিল। ভালো আয়-রোজগার ছিল, কিন্তু সেসব কিছুর পরোয়া না করে মাসুদের কাছে মনে হয়েছিল যে, বিপদ যতই আসুক সত্য উচ্চারণ করাটাই বেশি প্রয়োজন। এখন মুফতি মাসুদ সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ একজন মানুষ। ইউটিউবে ওর অসংখ্য ভিডিও আছে। ফেসবুক এবং বিভিন্ন ব্লগে ওর লেখাও আছে। ইতিপূর্বে সে দুটি বইয়ের অনুবাদ করেছে। আর এটি মুফতি মাসুদের প্রথম মৌলিক বই। আমি নিজেও মুফতি মাসুদের সাথে ইউটিউব ভিডিওতে কথা বলেছি। সে কেন ইসলাম ত্যাগ করেছে সেটি জিজ্ঞাসা করেছি। ও জানিয়েছে, মিথ্যার সাথে বেশিদিন আপোষ করে থাকা যায় না। ভালো ভালো খেয়েপরে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্য উচ্চারণ করে বিপদে পড়াকেই ওর কাছে উত্তম মনে হয়েছে। মানুষের মুক্তির যে ব্রত নিয়ে আমি লেখালেখি শুরু করেছিলাম আজ আমার স্নেহের মুফতি মাসুদ সেই ব্রত নিয়েই লেখালেখি শুরু করেছে। এখন অনেক মানুষই লিখছে। অনেক মানুষ কথা বলছে। এই তরুণদের অনেকেই আমার লেখা পরে অনুপ্রাণিত হয়েছে। মুফতি মাসুদ নিজেও ওর কিশোর বয়সে আমার লেখা পড়ে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিল। ও সে কথা বহুবার বলেছেও। আমি মুফতি মাসুদের এ বইটির সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি। আমি চাইছি, বইটি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের সবার ঘরে ঘরে থাকুক। ইসলাম সম্পর্কে সবাই জানুক। আমি আরও চাইছি, বাংলাদেশের প্রত্যেক মসজিদের ইমামরা মুফতি মাসুদের মতো হোক। যে সত্য তাঁরা জেনেছে সেই সত্য লুকিয়ে না রেখে সাহসের সাথে ইসলাম ত্যাগ করুক এবং এরপর সত্যকেই উচ্চারণ করুক।
তসলিমা নাসরিন