Mufti Masud
উপক্রমণিকা :
বাংলাদেশের সংবাদপত্রে মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্ষণ নিয়ে নিউজ হয়নি এমন দিন বোধহয় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। মনে হয় যেন করোনা ভাইরাস নয়, বরং ধর্ষণের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের দুর্গ কওমি মাদ্রাসায়। আগেও কি সেখানে ধর্ষণ হতো না? হতো। আগেও কি সেখানে শিশু নির্যাতন হতো না? হতো। কেন এখন তো খবর পাওয়া যাচ্ছে, আগে কেন খবর পাওয়া যেত না এ প্রশ্ন স্বভাবতঃই আপনার মনে জাগতে পারে। আসলে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার আগে আমরা একটু মাদ্রাসা নামক জগদ্বিচ্ছিন্ন অন্ধকূপের পরিবেশ কেমন সেটি বোঝার চেষ্টা করি চলুন। পরিবেশটা বোঝার পর কেন সেখানে এত বেশি ধর্ষণ হয় সেটি বোঝা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। প্রথমত শুরু করি যে শিশুটিকে কওমি মাদ্রাসায় দেয়া হয় সেই শিশুর পরিবার থেকে, এবং এরপর চলে যাব আমি মাদ্রাসার ভেতরকার পরিবেশে; আর সবশেষে চলে যাব মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে। কওমি মাদ্রাসায় যে শিশুদের দেয়া হয় তাদেরকে মূলত তিনটি কারণে দেয়া হয় :
প্রথমতঃ কোন এক পরিবারে শুধু মেয়ে জন্মগ্রহণ করছে এবং প্রত্যেকবার মেয়ে হওয়ার পর পরিবারের বৌটির উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসছে এবং অবশেষে সেই নারী নিয়ত করলেন ‘আল্লাহ যদি এবার একটা ছেলে দেয় তাহলে ছেলেটাকে মাদ্রাসায় দেব।’
দ্বিতীয়তঃ কোন পরিবারের পুরুষ লোকটি হুজুরের কাছে শুনেছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ করা ইসলামে হারাম, তাই তিনি হারাম থেকে বাঁচতে গিয়ে অনেকগুলি বাচ্চাকাচ্চা পয়দা করে ফেলেছেন। স্বল্প আয় নিয়ে এবং ছোট্ট বাসায় এতগুলো বাচ্চাকাচ্চার জায়গা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এবার বড় দু’একটা সন্তানকে স্কুলে রেখে নতুন জন্মগ্রহণ করা শিশুদের মাদ্রাসায় দিয়ে দেয়া হয়। কখনো বা বড় দু’একজনকে মাদ্রাসায় দিয়ে দেয়া হয়, কখনো বা সবাইকে।
আর তৃতীয় কাহিনীটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বাংলাদেশের সমাজে বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের যে কোন পুরুষই ইসলামের বহুবিবাহের ফতোয়ায় বিশ্বাসের কারণে পার্ভার্টেড হয়ে যায়। সে হুজুরদের কাছ থেকে ওয়াজ-নসিহতে শোনে – একজন পুরুষকে আল্লাহ চারটা বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। স্বভাবতঃই একটা স্ত্রী থাকার পর হুজুর-ভক্ত এই মুসলিম পুরুষটি আরও স্ত্রী খুঁজতে থাকে – পার্টটাইম স্ত্রী কিংবা ফুলটাইম স্ত্রী। আর এর বলি হয় মাদ্রাসার ছাত্র এবং তার মা। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বললে এরকম হয়। ধরুন কোনো একজন দিনমজুর, রিক্সাওয়ালা বা চাকরিজীবী ভদ্রলোক একটা বিয়ে করল। দুই তিনটা বাচ্চা হওয়ার পরেই তার দৃষ্টি চলে যায় অন্য নারীর দিকে, ‘পুরান বৌ’ এখন আর তার ভালো লাগে না! একপর্যায়ে তালাকের ‘মাধ্যমে পুরান বৌ’ বিদায় দিয়ে কিংবা পালিয়ে গিয়ে নতুন করে বিয়ে করে সংসার করে অন্য কোনো নারীর সাথে। তার প্রথম স্ত্রী তথা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ঘরের ছেলেদের ঠাঁই হয় মাদ্রাসায়, আর মেয়েদের ঠাঁই হয় মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে। ছেলেরা যেমন মাদ্রাসায় গিয়ে ধর্ষিত হয় মেয়েরা তেমনি গৃহকর্মী হিসেবে মানুষের বাড়িতে ধর্ষিত হয়।
এবার যে ছেলেগুলো মাদ্রাসায় গেল তারা সেখানে গিয়ে কী দেখে চলুন আমরা সেই পরিবেশটার দিকে একটু নজর করি, বা পরিবেশটাকে ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করি। মাদ্রাসায় যাওয়ার পর দেখতে পাওয়া যায় একটি জেলখানা, যে জেলখানার শিক্ষকরা কারারক্ষীর ভূমিকায় আছেন। জেলখানার ভেতরটা একটি শরিয়া আইনের ক্ষুদ্র স্টেট হয়ে আছে। সেখানে ছাত্রটা ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে প্রথমেই ৪০ টি হাদিস মুখস্ত করানো হয়। সেই ৪০ টি হাদিসের মধ্যে একটি হাদিস হচ্ছে, ‘‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম যার হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’’। আরেকটি হাদিস হচ্ছে, ‘‘যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন”। মাদ্রাসার জেলখানায় ছেলেগুলো যাওয়ার পরে তারা দেখতে পায় এক ধরনের হোঁদল কুতকুত, পানসে কিন্তু কঠোর স্বভাবের হুজুর। এই হুজুররা সচরাচর হাসেন না। ছাত্রদের সাথে সহজে মিশতে পারেন না। এই হুজুররা সবসময় গুরুগম্ভীর হয়ে থাকেন। তাঁরা সবসময় চারিপাশে ‘ইহুদি-নাসারার ষড়যন্ত্রের’ গন্ধে অস্থির থাকেন। মাদ্রাসার এই বদ্ধ কারাগারের ভেতরে গান, নাচ, চিত্রাংকন, সব ধরনের বিনোদন এমনকি জোরে জোরে হাসাও নিষিদ্ধ! রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে যেতে হয়, আর কলিংবেলের তীব্র শব্দে কিংবা হুজুরদের লাঠির আঘাতে ঘুম থেকে জাগতে হয় রাত সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে। এরপর এরপর শুরু হয় কোরআন মুখস্থ করার পালা। অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে হুজুরের কাছে কোরআন নিয়ে গিয়ে সবক (মুখস্তপাঠ) শোনাতে হয়। সবকে ভুল হলেই ধমক এবং মারপিটের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিদিন সকালে কিংবা কোন কোন দিন বিকেলে হুজুররা সব ছাত্রকে একত্র করে নসিহত (উপদেশ) করে। এই নসিতের মধ্যে নবীর প্রতি সাহাবীদের ভক্তির কাহিনী, ইমাম আবু হানিফার প্রতি তার ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী, জুনায়েদ বাগদাদীর প্রতি তার ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী, দেওবন্দের হুজুরদের প্রতি তাদের ছাত্রদের ভক্তির কাহিনী শোনানো হয়। হুজুরদের খেদমত (সেবা) করলে আল্লাহকে পাওয়া যায়, আল্লাহকে পেলে বেহেশত নসীব হয়; আর হুজুরদের সাথে বেয়াদবি করলে বা তাদের কথা না শুনলে আল্লাহ নারাজ হন, আল্লাহ নারাজ হলে দোজখে যেতে হয় এই হচ্ছে সেসব নসিহতের সারমর্ম। মাদ্রাসার হুজুরদের বেতন খুব সীমিত, আর মাদ্রাসার মধ্যে তাদের থাকার জায়গাটাও খুব সংকীর্ণ। অপরদিকে ছাত্ররাও শিক্ষকের কাছ থেকে ‘উস্তাদের ভক্তি ও খেদমতের গল্প’ শোনার পর উস্তাদের খেদমত করার প্রতি আগ্রহী হয়ে থাকে। সুতরাং যখন কোন শিক্ষক তার ছাত্রকে বলে, আমার কাপড়টা ধুইয়া দে, আমার জুতাটা মুইছা দে, আমার বিছানার চাদরটা পাল্টাইয়া দে, আমার থালা বাসনগুলো ধুইয়া আন তখন ছাত্র সেটা খুশিমনে হোক বা অখুশি মনে হোক, করে। হুজুরদের হাত-পা, মাথা টিপে দিতে বললেও ছাত্ররা তা করে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের জগতটা মাদ্রাসার ছাত্রদের মতই ছোট্ট। জেলখানার বন্দিদের জগত যেমন খুব ক্ষুদ্র তেমনিভাবে মাদ্রাসার ছাত্র এবং তাদের পাহারাদার হুজুরদের জগতটাও খুব ক্ষুদ্র। যে হুজুর সারাক্ষণ মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান করে সেই হুজুরের সামনে যেহেতু কোন বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই (কারণ জগতের সকল প্রকার বিনোদন ইসলামে হারাম), আবার অন্যদিকে বিবাহিত হুজুরের স্ত্রীও থাকে গ্রামের বাড়িতে, আবার ছাত্রদের পাহারা দেয়ার জন্য হুজুরদের মাদ্রাসার ভেতরে থাকাও বাধ্যতামূলক সেহেতু হুজুর তার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা মেটানোর সুযোগ পায়না। আবার হুজুর দেখতে পাচ্ছে, যেকোন কথা বলামাত্রই বা যেকোন নির্দেশ দেয়া মাত্র ছাত্ররা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হুজুরের নির্দেশ মেনে চলে। হুজুরের নির্দেশ অমান্য করলেই ধমক, পিটুনি এবং মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কারাদেশ সহ বহু রকমের নিপীড়ন নেমে আসে। সমাজের ‘গণ্যমান্য-জঘন্য’ ব্যক্তিবর্গের সবাই এই নিয়মটার মান্যতা দিয়েছে। স্বভাবতঃই মাদ্রাসার শিক্ষকের শরীরের মধ্যে যখন যৌনতার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয় তখন সে চোখের সামনে দেখতে পায় তার ছাত্রদেরকে। তখন সে নিজেকে যতটা যতটা সামলানোর চেষ্টা করে আসলে সে ততটা সামলাতে পারেনা, একপর্যায়ে বেসামাল হয়ে রাতের বেলা হুজুরটি তার ছাত্রকে বলে, ‘আমার ঘরে আইসা হাত-পা টিপে দে, মাথাটা বানাইয়া দে’। ছাত্র যখন হুজুরের হাত-পা কিংবা মাথা টিপে দেয় সেই সময়ে হুজুরের মধ্যে জেগে ওঠে শারীরবৃত্তীয় চাহিদা; আর এই চাহিদাটা হুজুর যখন বাস্তবায়ন করতে যায় তখন সে বিকৃতির আশ্রয় নেয়, যে বিকৃতিকে আমরা বলি ধর্ষণ।
ইদানিং মাদ্রাসার মধ্যকার ধর্ষণ নিয়ে কিছু খবর প্রকাশ করা হচ্ছে, কিন্তু এই ধর্ষণ কি আগে হতো না? আগে অবশ্যই হতো, কিন্তু আগে এসবের খবর প্রকাশ করা হতো না মূলত তিনটি কারণে :
১) সমাজের সাধারণ মানুষ ছেলে শিশুদের ধর্ষণকে ধর্ষণই মনে করত না
২) তখন মিডিয়ার এত দাপট ছিল না, তাই মিডিয়ার কাছে খবর যাওয়ার আগেই সেটাকে মাদ্রাসার হুজুর এবং মাদ্রাসার কমিটির লোকেরা ধামাচাপা দিয়ে ফেলত
৩) তখন ধর্ষণ বিষয়ে ছাত্রদের অভিভাবকদেরও সচেতনতা ছিল না। এখনও যে তাদের সচেতনতা খুব আছে আমার কিন্তু তা মনে হয় না।
মনে পড়ে, আমি যখন মাদ্রাসায় পড়তাম তখন আমার বাবা এবং আমার ক্লাসমেটদের বাবারা সবাই এসে হুজুরদেরকে বলতেন, ‘‘গোশত আপনার হাড্ডি আমার”, হঠাৎ আপনি আমার সন্তানকে পেটাতে পেটাতে শরীরের সমস্ত মাংস খসিয়ে ফেলুন তাতে সমস্যা নেই, আমাকে শুধু হাড়গোড় ফেরত দিলেই চলবে! ভাবতে পারেন কতটা রোহমর্ষক, কতটা বর্বর ছিল আমাদের বেহেশত-লোভী ছিল পিতারা! ভাবতে পারেন কতটা নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছিল আমাদের মায়েরা! ভাবতে পারেন, আজকের যুগে দাঁড়িয়েও এমন নিষ্ঠুর মা-বাবা আমাদের দেখতে হয়!
তো, মা-বাবাদের এই নিষ্ঠুরতা ও ওই ইসলামিক অনুভূতি তৈরি হয় কোত্থেকে জানেন? যে শিশুটির বাবা মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং ইমাম সাহেবের বক্তব্য শোনে, যে শিশুটির বাবা তাবলীগের বয়ান শোনে, যে শিশুটির বাবা ওয়াজ-মাহফিলের হুজুরের ওয়াজ শোনে সে-ই এমন নিষ্ঠুর হয়ে যায়; কারণ তার দরকার বেহেশত, হোক না তা ছেলের শৈশব কিংবা প্রাণের বিনিময়ে!
আমাদের সমাজের গণ্যমান্য-জঘন্য বা কথিত গুণীজনেরা মাদ্রাসা এবং এর বর্বরতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কয়েক রকমের মনো-সাইকোলজিক্যাল টোটকার আশ্রয় নেয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দুটো –
১) শয়তান টোটকা : একটি শিশুকে মাদ্রাসায় দিলে মাদ্রাসার অবর্ণনীয় নির্যাতন, বদ্ধ পরিবেশ, সর্বোপরি শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণ ইত্যাদি কেউই মেনে নিতে পারে না। এ সময়ে ছাত্ররা মাদ্রাসা ফাঁকি দেয়ার জন্য বহু রকমের কৌশলের আশ্রয় নেয়। সে চেষ্টা করে যেকোনভাবে মাদ্রাসার জেলখানা থেকে বের হতে, মাদ্রাসা ফাঁকি দিতে। এ সময়ে মাদ্রাসার ছাত্রের বাবাকে হুজুররা বোঝায়, আপনার ছেলেকে শয়তান ধরেছে, আপনার ছেলেকে জিনে ধরেছে, ওকে কোনভাবেই ঘরে রাখবেন না, ওকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেবেন, বাড়িতে গেলে মায়ের আদর পেয়ে ও নষ্ট হয়ে যাবে, শয়তান ওর মাথায় চড়ে বসবে। হুজুর কর্তৃক এই ব্রেনওয়াশড পিতাকে ছেলে যতই বলুক, হুজুর আমাকে অতিরিক্ত পেটায়, হুজুর আমাকে বিছানায় ডাকে, হুজুর আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে কিন্তু সেসব কথা নিষ্ঠুর এবং বেহেশত-লোভী বাবার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। হুজুররা যেহেতু বলে মাদ্রাসা ছাত্রদের শয়তান বেশি ধরে, তাই শয়তান তাড়ানোর জন্য হুজুররা ছাত্রকে যতই পেটাবে ততই সোয়াব (পুণ্য) হবে। হুজুররা যেখানে পেটায় সে জায়গা নাকি দোজখে যাবে না, সে জায়গা নাকি শহীদের মর্যাদা লাভ করে!
২) বেহেশত ওয়াজিব হওয়ার টোটকা :
আমাদের মা-বাবারা আরো বেশি লোভে পড়েন যখন তারা জানতে পারেন, একটি শিশু মাদ্রাসায় পড়ে হাফেজ হলে সে কেয়ামতের দিন তার পরিবারের এমন দশজনকে বেহেশতে নিতে পারে যে দশজনের জন্য জাহান্নাম (নরক) ওয়াজিব হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশায় একজন মা কিংবা বাবা যদি কল্পনা করেন যে, আমার সন্তান মাদ্রাসায় গিয়ে পিটুনি খেলে, আমার সন্তান মাদ্রাসার ভেতরে আটকে থেকে গুমরে মরলে এর বদলে আমি যদি জাহান্নামের ভয়ংকর আগুন থেকে বাঁচতে পারব তবে এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে আপনি কোন যুক্তিতে উড়িয়ে দেবেন?
ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, “ভারত সরকার মুসলিমদের অধিকার হননের ব্যাপারে অতিমাত্রায় তৎপর।”
গতবছর ভারতের বুদ্ধিজীবী অরুন্ধতী রায় ডয়চে ভেলের কাছে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ভারত সরকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করেছে।” উল্লেখিত দু’জন বুদ্ধিজীবীর এই বক্তব্যের কাটাছেঁড়ায় আমি যাচ্ছি না। আমি কেবল বলতে চাচ্ছি, ভারতে যে লক্ষ লক্ষ কওমি মাদ্রাসা আছে আর সেই কওমি মাদ্রাসায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শিশুদের ধর্ষণ করা হয়, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শিশুর উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে তা নিয়ে কি আপনাদের মাথাব্যথা আছে হে বুদ্ধিজীবী? নেই।
বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চুপ, কারণ তাদের মধ্যে দুই ধরনের মনোবৃত্তি কাজ করে
১) ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে আরবদের খুশি রাখা
২) সস্তা বক্তব্য দিয়ে মুসলিম বিশ্ব এবং পাশ্চাত্যে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চিন্তা
বাংলাদেশে ইদানিং মাদ্রাসার ভেতরের ধর্ষণ নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়, কিন্তু ভারতে? সেখানে কিছুই হয় না। ভারতের কওমি মাদ্রাসার হুজুররা কি এত বেশি সৎ হয়ে গেল যে, সেখানে তারা কাউকে কখনো ধর্ষণ করে না? ভারতের কওমি মাদ্রাসার হুজুররা বাংলাদেশের হুজুরের যে পরিমাণ ধর্ষণ করে সেই পরিমাণ ধর্ষণই করে। কারণ, দুটি দেশেরই কওমি মাদ্রাসার একরকম চেহারা। দুটি দেশেরই কওমি মাদ্রাসা নিয়ে চলে একইরকম রাজনীতি।
কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ায় কেন মাদ্রাসার শিশু ধর্ষণ নিয়ে নিউজ হয় না?
এর প্রধানত দুটি কারণ :
১) মুসলিম বিশ্ব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বিরাগভাজন হতে না চাওয়া
২) মুসলিম বিদ্বেষী বা ইসলামবিদ্বেষী তকমা পাওয়া থেকে সতর্কতার সাথে দূরে থাকা।
একটি প্রশ্ন :
বুদ্ধিজীবীরা একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মুখে ঢিলা-কুলুখ পরে থাকে কেন?
একথা ঠিক, কোন মাদ্রাসার শিশুকে ধর্ষণ করলে সেটি নিয়ে আগে যেমন অভিভাবকেরা একেবারে চুপ থাকত এখন তারা কিছুটা হলেও নিরবতা ভেঙেছে। ভারতে এখনো পর্যন্ত সেটি হয়নি কারণ, ভারতের কোন মাদ্রাসায় কোন ছাত্রকে ধর্ষণ করা হলে তার অভিভাবককে বারবার বোঝানো হয়, আমরা মুসলিমরা এ দেশে সংখ্যালঘু, আমরা এখানে অত্যাচারিত, এ দেশের হিন্দুরা আমাদের মাদ্রাসা বন্ধ করে দেবে, ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে, সুতরাং তোমরা চুপ থাকো। এই কাজটাতে তারা বেশ সফল হয়। কিন্তু আসলে কি তারা সফল? না। আমি তো দেখি তারা ব্যর্থ। মাদ্রাসার হুজুরেরা এবং ছাত্ররা সবসময় সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করে। তাঁরা সমাজের নিম্নবর্গীয় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়। উচ্চবর্ণের লোকেরা – তথা সমাজের বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদরা তাদের নিয়ে কথা বলে না। তাদের কোথাও ডাকে না। তাদের রাখা হয় পাদপ্রদীপের অন্ধকারে। একজন ব্রাহ্মণ যেমন তার সন্তানের সাথে শূদ্রের বিয়ে দিতে লজ্জা পায় ঠিক তেমনিভাবে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্রাহ্মণ তথা বুদ্ধিজীবীরাও মাদ্রাসার মতো ব্যাপার নিয়ে, হুজুরদের মতো ব্যাপার নিয়ে, সমাজের সাধারণ কোন বিষয় নিয়ে, সাধারণ কোন মানুষ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়।
বুদ্ধি-ব্রাহ্মণ অমর্ত্য সেন, বুদ্ধি-ব্রাহ্মণ অরুন্ধতী রায়ের মতো মানুষেরা নিম্নবর্গীয় জাত মাদ্রাসার হুজুর নিয়ে কথা বলবে কেন? তাতে জাত যায় না?! আমরা কেবল গায়ের রং কিংবা বংশের নাম দিয়ে যে জাতপাত ভেদ করা হয় সেটার বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু আপনার আমরা চিন্তাভাবনার বর্ণবাদ নিয়ে কথা বলি না। চিন্তাভাবনার বর্ণবাদ কি জানেন? চিন্তাভাবনার বর্ণবাদ হচ্ছে চিন্তার ক্ষেত্রে আমি আমার নিজের লেভেলের নিচে নামব না, অর্থাৎ আমি অমর্ত্য সেন নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করতে পারি তাতে আমার চিন্তার জাতপাত ঠিক থাকবে। কিন্তু আমি মাদ্রাসা নিয়ে কথা বললে জাত থাকবে? মাদ্রাসার নাম নিলে বুদ্ধির গঙ্গাজলে স্নান না করা পর্যন্ত শুদ্ধ হওয়া যাবে না! বুদ্ধির এই ব্রাহ্মণ্যবাদের কারণেই মুসলিম নারীরা, তিন তালাকের শিকার হয়ে যাদের জীবন তছনছ হয়ে গেছে তাদের আলোচনা অরুন্ধতীর টেবিলে অস্পৃশ্য।
উপসংহার :
যারা মাদ্রাসা পরিচালনা করে তাদেরকে বলা হয় মাদ্রাসার কমিটির লোক। যারা মাদ্রাসা ও মসজিদ পরিচালনা করে তাদের কেউ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সভাপতি, কেউ সেক্রেটারি, কেউ প্রচার সম্পাদক, কেউ অর্থ সম্পাদক, কেউবা কর্মী। যে যত বড় দুর্নীতিবাজ ও মাস্তান সে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির তত বড় হোমরা চোমরা। এরা সাধারণত নিম্নমানের মূর্খ হয়, যেমনটি বাংলাদেশের রাজনীতির চিরায়ত সৌন্দর্য (?)। এই মূর্খ রাজনীতিকেরাই ইসলামের রক্ষক। ওরা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করে, ওয়াজ-মাহফিলে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে, ইসলামের জন্য জান কোরবান করে। পাবলিককে খুশি করার জন্য এরা কখনো বলে, ‘নাস্তিকদের কেল্লা নামিয়ে ফেলব!’ কখনো বলে, ‘অমুক দেশের ইসলামবিদ্বেষী প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে আমি ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে চাই!’ যারা মসজিদ ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারি, মোতোয়াল্লী হয় এবং তারা দুর্নীতিবাজ, লম্পট এবং চরিত্রহীন হয়। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার পর বিত্তের জোরে ওরা বেহেশত এবং চারিত্রিক সার্টিফিকেট দুটোই কিনতে চায়। এই সময়ে তারা দুটি বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে : এক) বেহেশতের ঘোষিত টিকেট ২) চরিত্রের ঘোষিত সার্টিফিকেট। এই সার্টিফিকেট সমূহ দেয়ার জন্য তাদের দরকার একদল নিষ্পাপ মানুষ যাদেরকে বলা হয় আলেম বা হুজুর। অবশ্য হুজুরদের চরিত্র কেমন হয় সেটা আমাদের এখন আর অজানা নয়! আমাদের দুর্নীতিবাজ নেতাদেরও সেটি অজানা নয়। দুর্নীতিবাজ নেতাদের বেহেশ্তের সার্টিফিকেট এবং চারিত্রিক সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য এবং এর পাশাপাশি মাদ্রাসা ছাত্রের মা-বাবারও বেহেশত নিশ্চিত করার জন্য যে অশুভ প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে তারই নাম মাদ্রাসা। সুতরাং মাদ্রাসায় ধর্ষণ হোক, খুন হোক, নির্যাতন হোক তা নিয়ে আমাদের বেহেশত-লোভী মাতাপিতা এবং সার্টিফিকেট লোভী নেতাদের মাথা ঘামানোর টাইম কই? ভারতের বুদ্ধি-ব্রাহ্মণদেরই বা সময় কই?
ওয়াজে, চল্লিশায়, মৃত্যুবার্ষিকীতে, সুন্নতে খতনায় হুজুররা যেভাবে দুর্নীতিবাজ নেতাদের মাতাপিতা, ভাইবোন, শ্বশুর-শাশুড়ি, শালা-শালী সহ চৌদ্দ গুষ্টিকে বেহেশতে পাঠায় তার নমুনা জগতে আর কোথায়ইবা আপনি পাবেন? কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে, শত শত মানুষ খুন করে, হাজার মানুষের জমি দখল করার পর যদি হুজুরদের সামান্য দিলেই বেহেশ্তের সার্টিফিকেট চারিত্রিক সার্টিফিকেট সব পাওয়া যায় তবে কেন বন্ধ হবে এ আয়োজন? বরং মাদ্রাসার এই আয়োজিত ধর্ষণের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাঁকেই তো মেরে ফেলতে হবে, তাই নয় কি?
লেখক ও গণমাধ্যম কর্মী সাইফুল বাতেন টিটো সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন যেখানে তিনি পত্রিকার নিউজের সূত্র ধরে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসায় ঘটা গত একমাসের খতিয়ান তুলে ধরেছেন। টিটোর লেখার কিছু অংশ তুলে ধরেই আমার এ নিবন্ধের ইতি টানছি :
“অক্টোবর ২০২০ মাসে কওমি মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও শারিরীক নির্যাতনের মোট ৩৩ টি ঘটনা আমারা জানতে পেরেছি জাতীয় ও অনলাইন পত্রিকাগুলো থেকে। সেখানে দেখা যায় ১ অক্টোবর ২০২০ থেকে ৩১ অক্টোবর ২০২০ এই পুরো এক মাসে ৩৩ টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে যার মধ্যে ২৪ টি ছেলে শিশু আর ৯ টি মেয়ে শিশু। একটি শিশুকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে ৭ টি শিশুর উপর। অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে ৬৬ টি শিশুর উপর। সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম আর সিলেট অঞ্চলে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের যে সকল এলাকা থেকে বেশি পরিমান লোক দেশের বাইরে থাকে এবং ধার্মিক ও অপরাধপ্রবন হয় সেইসব এলাকার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগ ও সিলেট বিভাগ উল্লেখযোগ্য।”
