Mufti Masud
অন্য সব মুসলমানদের মত আমিও ছোটকাল থেকে জানতাম আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদের দুজন স্ত্রী ছিলেন। প্রথমজনের নাম খাদিজা, আর দ্বিতীয়জন আয়েশা। খাদিজা মারা যাওয়ার পর তিনি আয়েশা নামের একজন গুণবতী, রূপবতী, বুদ্ধিমতী নারীকে বিয়ে করেন। অর্থোডক্স মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও আমি জানতাম না, শৈশবের সেই প্রিয়নবীর অনেকগুলো (প্রায় তেরজন) স্ত্রী ছিল! তিনি যখন ৫১ বছর বয়সে বিয়ে করেন তখন তাঁর বৌ আয়েশার বয়স ছয় বছর ছিল। সম্ভবত ১৯৯৭ সালের ঘটনা সেটি, আমি এবং আমার ক্লাসমেট মিজান কোথাও ঘুরতে গিয়েছিলাম। নদীর পাড় ধরে হাঁটার সময় মিজান আমাকে বলল, ‘মাসুদ তুই কি জানোস, আমগো নবী না হযরত আয়েশারে যহন বিয়া করে তহন হযরত আয়েশার বয়স আছিল ছয়?’ আমি বললাম, ‘না তো, এইডা সত্য কতা না। তুই মিথ্যা কতা কইতাছোস! তোরে শয়তানে ধরছে, আল্লার ধারে মাফ চা!’
আমার শিক্ষক মাওলানা আরিফ হক্কানীকে একদিন বলেছিলাম, ‘হুজুর আমাকে খালি শয়তান ধোঁকা দেয়, নবীজির চরিত্র ও যুদ্ধ নিয়ে শয়তান মনের মধ্যে বিভিন্ন কুমন্ত্রণা দেয়। এটা থেকে বাঁচার কি উপায়?’ (উল্লেখ্য, ছোটবেলায় আমি আমার গ্রামের বাড়ির এবং পুরান ঢাকার আঞ্চলিক মিশ্র টানে কথা বলতাম। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই আমি শুদ্ধভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেছি।) আমার শিক্ষক আমাকে স্নেহের সাথে বোঝালেন, কিছু দোয়া ও আমল শিখিয়ে দিলেন। নামাজের পর বগলের নিচে হাত দিয়ে একটি দোয়া পড়তে বললেন, এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে আরো একটি দোয়া এবং আয়াতুল কুরসি পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দুই হাত বুলাতে বললেন। যখনই শয়তানের কুমন্ত্রণা মনে আসবে তখনই কিছু দোয়া আছে যে দোয়া আমি এখনও জানি, সে দোয়াগুলো তিনি আমায় তখন পড়তে বললেন। যেদিন উরায়নার হাদিস আমরা পড়লাম সেদিন শয়তান আমাকে প্রচন্ডভাবে ঝাঁকুনি দিল। আমার একজন ক্লাসমেটকে জানালাম যে, শয়তান আমাকে শুধু কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। উল্লেখ্য, আমার সেই ক্লাসমেট এখন একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল; সে বলল, ‘শয়তান তো একই ধোঁকা আমারেও দিতাছে! কি করমু?’
ছাত্র জমানায় লাস্ট দুই বছর আমার যে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ প্রগতিশীল বন্ধু ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম মোস্তফা ভাই। মোস্তফা একদিন চুল কাটতে গিয়ে দাড়িগুলোকেও একটু ছোট করেছিল। আমাদের শ্রেণী শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মতিন ক্লাসের মধ্যে তাফসীরে বায়যাবী পড়ানোর সময় হঠাৎ খেয়াল করে দেখলেন মোস্তফার দাড়ি একটু ছোট। তিনি এমনভাবে ক্রুদ্ধ হলেন মনে হয় যেন তাঁর ছেলেকে ছেলের হত্যাকারীকে তিনি পেয়ে গেছেন! প্রচন্ড বকাঝকা করে মোস্তফাকে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন। মোস্তফা এরপর আব্দুল মতিন হুজুরের মসজিদে গিয়ে যোহর কিংবা আসরের নামাজের পর মসজিদের মধ্যেই হুজুরের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলো। হুজুর ঝটকা মেরে তাঁকে সরিয়ে দিল। যে ছেলে সুন্নতের বরখেলাপ করে এভাবে দাড়ি ছোট করে এমন ছেলের কোন ক্ষমা নেই। যদিও পরে মোস্তফার ক্ষমা মিলেছে। ঘটনা জানার পর শয়তান আবারো আমাকে ধোঁকা দিতে লাগল। শুধু আমাকে কেন, আরো দুজনকেও কি ধোঁকা দেয়নি? এত কঠোরতা কি আমরা পছন্দ করেছিলাম? সে বছর আমি আমার বাবার কাছে বললাম যে, এই বছর পড়াশোনা শেষ এই আমি মাওলানা হয়ে যাচ্ছি কিন্তু শয়তান আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে। আব্বা বললেন, তুমি অমুক অমুক দোয়া পড়ো। এরপর আমাকে ইমাম গাজ্জালীর কয়েকটা বই ধরিয়ে দিলেন। মাওলানা হাকিম আখতারের বই “তাআল্লুক মাআল্লাহ” (আল্লাহর সাথে সম্পর্ক) তিনি আমাকে পড়তে দিলেন। শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি তার ছেলেকে একজন জবরদস্ত আলেমের কাছেও নিয়ে গেলেন।
এখন প্রশ্ন জাগে, শুধু কি আমাকে? আরো অনেককেই কি শয়তান তখন ধোঁকা দেয়নি? সিহাহ সিত্তার হাদিসগুলো আমরা আমাদের দাওরায়ে হাদিসের ক্লাসে পড়েছিলাম। ক্লাসে কেউবা হাদিস পড়ত, কেউবা ঘুমাত, কেউবা অন্যদের সাথে দুষ্টুমি করত। কেউবা হাদিস পড়ার সময়ে সোনামিয়ার মত লুঙ্গির নিচে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকত। কিন্তু আমি? সেই কথিত শয়তান তখনও আমাকে ধোঁকা দিয়েছিল। আমি বাংলা সাহিত্যের বই, গল্পের বই, কবিতার বই, উপন্যাসের বই ইত্যাদি পড়তাম। হুজুর আমাদের বুখারি পড়াচ্ছে, অথচ আমি পড়ছি সমরেশ মজুমদারের বই; তাও আবার বুখারি কিতাবের উপর রেখেই পড়ছি!
বটতলা মাদ্রাসায় থাকতে আমাদের ক্লাস ক্লাসমেট ঢাকার জুরাইন এলাকার ইকবালুস সালাম ও তাঁর আরেকজন বন্ধু মাথার চুল ফ্যাশন করে রাখত। মাথায় টুপি, কিন্তু টুপির নিচে মাথার সম্মুখভাগের চুলগুলো বড় বড়। হুজুররা কেচি দিয়ে সামনের চুল বড় করে কেটে দিতেন। আমাদের হুজুরেরা সবার চুল চেক করতেন। অনেক সময়ই সকল ছাত্রের মাথা কামিয়ে ফেলার ফরমান জারি করতেন। চুল কামানোর বা মাথা মুন্ডন করার বিশেষ আরেকটি কারণ হচ্ছে, মাদ্রাসার ছোট ছেলেদের সাথে বড় ছেলেদের পায়ুকামিতা। ছেলে ধর্ষণের বিরাট এক রোগে আক্রান্ত ছিল পুরো মাদ্রাসা – অবশ্য সব কওমি মাদ্রাসার মধ্যে থাকা এ এক কমন রোগ। ঐ ধর্ষণ থেকে বাঁচানোর জন্যই ছোট-বড় সকলের চুল কামিয়ে ফেলার ফরমান জারি হত কিছুদিন পরপর। উদ্দেশ্য হচ্ছে, ছোট ছেলেদের দেখতে যাতে কিছুটা কদাকার দেখায়। কিন্তু এর ফলাফল তেমন একটা হয়নি। শয়তান কি ইকবালুস সালামকে ধোঁকা দেয়নি? কি ধোঁকা? ধর্ষণের? না, তা নয়। বিদ্রোহী মনের, ফ্যাশনেবল ইকবাল ধর্ষক ছিল না। ধর্ষক ছিল লম্বা কোর্তাওয়ালা দরবেশগুলা।
সূরা আহযাবের তাফসীর যখন মাদ্রাসায় পড়েছিলাম তখন তো শয়তান আমাদের অনেককেই ধোঁকা দিয়েছিল। নবী কেন কোরআনের আয়াত নাজিল করে বিয়ে করেন? আল্লাহ কেন নবীর পছন্দের নারীর সাথে নবীকে নিজেই বিয়ে দেন? নবীর স্ত্রীরা তাঁর ঘনঘন বিয়ে নিয়ে বিরক্ত হলে আল্লাহ কেন আয়াত নাজিল করে নবীর স্ত্রীদের হুমকি দেন? কোরআনের তাফসির পড়ার সময়ে এবং হাদিস পড়ার সময় শয়তান তো বারবার আমাদের ধোঁকা দিয়েছিল। প্রত্যেকটা মাদ্রাসা পাশ ছেলেই তো তার সারাজীবন শয়তানের এই ধোঁকাবাজির সাথে লড়াই করে জীবন পার করে দেয়। সমাজের পুঁজিপতি, সমাজের রাজনীতিবিদ ও সমাজের সুশীলেরা হুজুরদের জন্য এই নিয়ম বরাদ্দ করে রেখেছে যে তারা সারাজীবন শয়তানের ধোঁকার সাথে লড়াই করে কাটাবে। তাদের যখন মনে হবে ঐ কাজটা নবীর অন্যায় ছিল, যুদ্ধবন্দি নারীদের ধর্ষণ করাটা ঠিক হয়নি, গণহত্যা করা ঠিক হয়নি, গুপ্তহত্যা করা ঠিক হয়নি, এতগুলো বিয়ে করা উচিত হয়নি, শিশুকে বিয়ে করা উচিত হয়নি তখনই তারা এন্টি-ধোঁকার দোয়াগুলো আওড়াবে। নিজের বুকে থুতু দেবে। শয়তানের পছন্দের দিক তথা বাঁ’দিকে থুথু ফেলবে। এই-ইতো নিয়তি।
আমি যখন আমার উপর চাপিয়ে দেয়া অন্ধকার থেকে আলোর পথে ক্রমশ বেরিয়ে আসতে লাগলাম তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল, আসলেই কি মনের মধ্যে উদয় হওয়া সেসব প্রশ্ন কি শয়তানের ধোঁকা ছিল নাকি ছিল বিবেকের তাড়না? আজও আমি আমার ক্লাসমেট বন্ধু এবং যারা মাদ্রাসায় পড়ে ও পড়ায় তাদের কাছে এই প্রশ্ন রাখতে চাই আপনি যে, প্রতিনিয়ত আপনারা যে নিজেদের মনের সাথে যুদ্ধ করছেন সেটি কি শয়তানের ধোঁকা নাকি আপনার বিবেকের তাড়না? কতদিন বিবেকের তাড়নাগুলিকে গলা টিপে টিপে হত্যা করতে থাকবেন?