Mufti Masud
১৯৯৪ সালের কথা। মাদ্রাসা ছুটি দিয়েছে, তাই গ্রামের বাড়িতে গেছি। তখন দেখতাম, গ্রামের ছেলেমেয়েরা গাছে কোন পোকা দেখলে মেরে ফেলত। ওরা বিচ্ছু দেখলে মেরে ফেলত, এমনকি কাঠবিড়ালি দেখলেও মেরে ফেলত। পাখি দেখলে অনর্থক ঢিল ছুঁড়ে মারতো। ওদের দেখাদেখি আমিও তাই শিখেছি। পাখি দেখলে ঢিল নিয়ে নিশানা প্রাকটিস করতাম। একদিন গ্রামের ঘ্যাডল দিয়ে খেলছিলাম। ঘ্যাডল দেখতে কিছুটা কচুর মতো। খাওয়া যায় না, তবে বাচ্চাদের খেলার জন্য বেশ কাজের। একটি লাল পিঁপড়া আমাকে কামড় দিলে আমি পাইকারি হারে সব পিঁপড়া মারতে লাগলাম। বন্ধু শাহীন বলল, “লাল পিঁপড়া মার, কালা পিঁপড়া মারিস না, কালা পিঁপড়া মোসলমান পিঁপড়া আর লাল পিঁপড়া হিন্দু পিঁপড়া”। কালো রংটা আমার কাছে অপছন্দের ছিল। ছোটকাল থেকেই আমাকে আমার সমাজ কালোর প্রতি বিদ্বেষ শিখিয়েছে। কালো চেহারার মানুষেরা নাকি খারাপ, বিশেষত কালো মেয়েরা নাকি খুবই খারাপ। কিন্তু এখন লাল পিঁপড়া দেখতে সুন্দর হলেও হিন্দু হওয়ার কারণে তাকে মারতে হবে, আর কালো পিঁপড়া দেখতে অসুন্দর হলেও মুসলমান হওয়ার কারণে তাকে মারা যাবে না। কি এক বিপত্তি!
একদিন কোন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়কে জলের গ্লাস দিয়েছিলাম বাঁ হাত দিয়ে, অবশ্য বেখেয়ালবশত। সাথে সাথেই তিনি বললেন, গ্লাসটা ডানহাতে দেয়া গেল না? তখন আমার সেই ১৯৯৪ সালের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। হিন্দু পিঁপড়ার ঘটনাটি মনে পড়ে গেল। তাহলে ডানহাত কি মুসলমান হাত? বাঁ হাত কি হিন্দু হাত? হিন্দু হাতটি কি মুসলিম হাতকে জিযিয়া দেয়? হিন্দু হাত দিয়ে খাওয়া, কাউকে কিছু দেয়া বা গ্রহণ করা কিংবা বিল পরিশোধ করা, লেখালেখি করা, শিশুদের আদর করা এসব কিছু নিষেধ। হিন্দু হাত কেবল জুতা বহন করা, শৌচকাজ করা এবং নাক পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার করা যায়। যদি কল্পনা করি যে, পুরো পৃথিবীর মানুষেরা মুসলিম হয়ে গেছে, কিন্তু তখনও তো ইসলামের সার্বক্ষণিক ফরজ জিহাদ বন্ধ করা যাবে না তখন কি হবে? তাহলে কি তখন মুসলমানের ডান হাতের সাথে মুসলমানের বাম হাতের জিহাদ হবে? এটাই কি তখন মুসলমান বনাম কাফেরের জিহাদ হিসেবে গণ্য হবে? ডান হাত কি আল্লাহু আকবার বলে জিহাদ শুরু করবে? তাহলে পৃথিবীর লাস্ট জিহাদ কি মুসলমানের দুই হাতের মধ্যেই সংঘটিত হবে?
ইসলামের হাদিসের গ্রন্থ আবু দাউদের একটি বর্ণনায় আছে, ইসলামের নবী মোহাম্মদ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজে জিহাদে অংশগ্রহণ করল না, মুজাহিদদের (জিহাদী) যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থাও করল না এবং কোনো মুজাহিদের অবর্তমানে তার পরিবার-পরিজনের তত্ত্বাবধান করল না, আল্লাহ তা’আলা তাকে কিয়ামতের পূর্বে (দুনিয়াতেই) কঠিন বিপদাপদে নিপতিত করবেন। (আবূ দাঊদ ২৫০৩)।
অনেকেই বলে থাকেন, আগে নাকি হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি খুব ছিল। আগে নাকি হিন্দু-মুসলমানরা পরস্পর পরস্পরকে খুব সম্মান করত। যারা বলে থাকেন, আমি নিশ্চিত তারা মাদ্রাসায় পড়েননি। শুধু তাই না, তারা সম্ভবত ভিন্ন কোন জগতে বসবাস করতেন যে জগতটা বাংলাদেশ থেকে আলাদা। আমি যখন আমার গ্রামের বাড়িতে যেতাম তখন শুনতে পেতাম গ্রামের অন্য ছেলেরা আমাকে বলত, হিন্দুদেরকে নোমো বলে ডাকতে হবে। গ্রামের ছেলেরা হিন্দুদের নোমো বলে গালি দিত। শুধু কারণেই না, অকারণেও গালি দিত। তবে বড়রা কারণ ছাড়া হিন্দুদের মোমো বলে গালি দিত না। হিন্দু দোকানদারের সাথে মুসলমান কাস্টমারের কিংবা হিন্দু কাস্টমারের সাথে মুসলমান দোকানদারের কোন পণ্য নিয়ে কথা কাটাকাটি হলে বা কোন কারণে বাকবিতণ্ডা হলে তখন হিন্দুকে নোমো বলে গালি দেয়ার প্রথা ছিল। একদিন আমার মা আমাকে বাজার থেকে কিছু কেনার জন্য পাঠিয়েছেন। আমি দোকানে গেলাম। দোকানের সামনে একজন হিন্দুর সাথে একজন মুসলমানের ঝগড়া দেখতে পেলাম। ঝগড়ার বিষয়বস্তু ছিল সম্ভবত ওই হিন্দুর ছেলে এবং মুসলমানের ছেলের মধ্যে একটা মারামারি বা হাতাহাতি টাইপের কোন একটা ঘটনা। ঝগড়ার একপর্যায়ে মুসলমান লোকটি বলে উঠল, এই জিন্যেই তো কই, এই নোমোগো জাতটাই খারাপ”। পাশ থেকে আরেক মুসলমান বলে উঠল, “এই জিন্যেই আল্লাহ ওগো মালাউন কইছে”। হিন্দুদেরকে আল্লাহ মালাউন বলেছেন এটি আমি এই প্রথম জানতে পারলাম। আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হলো, দুনিয়ার সব হিন্দুরাই কি মালাউন? আমরা যে দোকান থেকে মুদি সদাইপাতি করি সেই নিখিল কাকুও কি মালাউন? কিন্তু নিখিল কাকু তো ভালো মানুষ, খুব অমায়িক তাঁর ব্যবহার, তিনি কেন মালাউন হবেন?
তখন আমি মালাউন শব্দের অর্থ জানতাম না। পরে অবশ্য জেনেছি। এর অর্থ অভিশপ্ত। কোরআনের আল্লাহ বা ইসলামের আল্লাহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষকে অভিশাপ দিয়েছেন। মানুষ সাধারণত মানুষকে অভিশাপ দেয় তার অক্ষমতার কারণে, অর্থাৎ যার উপরে সে ক্রুদ্ধ তাকে শাস্তি দিতে না পেরে বা তাকে আঘাত করতে না পেরে অভিশাপ দেয়। আল্লাহ কি শাস্তি দিতে ব্যর্থ? আল্লাহর মনের মধ্যে কি অমুসলিমদের প্রতি প্রচন্ড ক্রোধ রয়েছে? ক্রোধ থাকলে তিনি তাদের ধ্বংস করছেন না কেন? আবার যদি তাদের ধ্বংস করতে হয় তাহলে তিনি তাদের সৃষ্টি করলেন কেন? আর যদি তিনি সৃষ্টিও করেন ধ্বংসও করেন তবে এটার দ্বারা তার ফায়দাটা কি হবে? তিনি একদল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কি অভিশাপ দেয়ার জন্যই? তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন কার কাছে? কার সাহায্য তিনি চাইছেন? তিনি না সর্বশক্তিমান? তাছাড়া তিনি যদি মুসলমান ছাড়া অন্যদের প্রতি এত ক্রুদ্ধই হয়ে থাকেন তবে নিজেই কেন তাদের ধ্বংস করছেন না? কেন মুসলমানদেরকে হুকুম দিচ্ছেন অমুসলিমদের হত্যা করার জন্য? কেন মুসলমানদের নির্দেশ দিচ্ছেন অমুসলিমদেরকে জোর করে ইসলামের দীক্ষিত করার জন্য? তবে কি আল্লাহ সর্বশক্তিমান নন? তবে কি আল্লাহ তার বান্দাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নন? তিনি তো ‘কুন’ বা হও বললেই হয়ে যায়। তাই যদি সত্য হয় তবে তিনি কুন বলছেন না কেন? আবার যদি বলা হয় যে, তিনি কিছু লোককে জাহান্নামে নিতে চান তবে কিছু লোককে কেন? সবাইকে কেন নয়? যে লোকেদেরকে তিনি শাস্তি দিতে চান তারা আল্লাহর কাছে ভিলেন হয়ে গেল কেন? আবার যাদের তিনি শাস্তি দিতে চান না বরং পুরস্কার দিতে চান তারা আল্লাহর কাছে নায়ক হয়েছেন কেন? আল্লাহ তথা সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টি তথা বান্দাদের ব্যাপারে দুই রকমের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কেন? এবার বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন। তিনি পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষায় যারা পাস করছে তাদেরকে জান্নাত দিচ্ছেন আর যারা ফেল করছে তাদের তিনি দিচ্ছেন জাহান্নামে। এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। কোরআন এবং হাদিস ঘাটলে পাওয়া যায়, মানবজাতির সৃষ্টির বহু বছর পূর্বেই আল্লাহ কোন মানুষ কি করবে, কোন মানুষ জান্নাতে যাবে এবং কোন মানুষ জাহান্নামে যাবে তার সবকিছুই লিখে রেখেছেন। মানবজাতির সৃষ্টির পূর্বেই তিনি কোরআন লিখেছেন শুধু তাই না, তিনি কোরআন আবৃত্তিও করেছেন। এজন্যই কোরআনকে কালামুল্লাহ বা আল্লাহর কথা বলা হয়। কোরআনে বিভিন্ন সময়ে সমসাময়িক বিভিন্ন প্রেক্ষিতে সূরা এবং আয়াত নাজিল হয়েছে। ধরা যাক মোহাম্মদের পুত্রবধূ বিয়ে করার ব্যাপারটাকেই। মোহাম্মদ যখন তার পালকপুত্র জায়েদের স্ত্রী জয়নবকে পছন্দ করে ফেললেন বা মোহাম্মদের মনের মধ্যে পুত্রবধূ জয়নবের প্রতি প্রেম তৈরি হলো তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করে মোহাম্মদকে বললেন যে, তোমার সাথে আমি আল্লাহ নিজেই জয়নবের দিয়ে দিলাম। কোরআনের সূরা আহযাবের (৩৩ নম্বর সূরা) ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ওদের একটি দলকে তোমরা হত্যা করছো এবং অন্যদলকে তোমরা বন্দি করছো”। এই আয়াত তৎকালীন মদিনায় বসবাসরত বানু কুরাইজা গোত্রের লোকদের ইহুদিদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদের চালানো গণহত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ বানিয়েছিলেন। মুসলমানরা এই গোত্রের কিছু লোককে হত্যা করেছে এবং বাকিদেরকে বন্দি করে দাস-দাসী বানিয়েছে। একথা আল্লাহর কোরআনের মধ্যেই যেহেতু আছে সুতরাং ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি মানবজাতির সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন। তাই যদি হবে তবে বানু কুরাইজা গোত্রের লোকদেরকে যে মোহাম্মদ হত্যা করবে সেটিও মানবজাতি সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন। ইহুদিরা নাকি মোহাম্মদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। যদিও তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন দাবির স্বপক্ষে মোহাম্মদ কোন তথ্য এবং যুক্তি প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। বরং তিনি দাবি করেছেন যে, আল্লাহ তাকে ব্যাপারটা জানিয়েছেন এবং এই দাবির উপর ভিত্তি করে তিনি এই গোত্রের প্রায় ৯০০ জন পুরুষকে জবাই করে হত্যা করেছেন। এবার যদি ধরি যে, এই গোত্রের লোকেরা সত্যিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তবে তা তো আগে থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল! আল্লাহ তো মানবজাতির সৃষ্টির বহুবছর পূর্বে লিখে রেখেছিলেন যে, বানু কুরাইজার লোকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করবে। একইভাবে মানবজাতির সৃষ্টির বহু বছর আগেই তিনি লিখে রেখেছেন যে, মোহাম্মদ এই গোত্রের লোকেদের ধরে ধরে জবাই করে হত্যা করবে। তাহলে যা কিছু ওরা করবে বলে আল্লাহ ঠিক করে রেখেছেন তাই তো হওয়ারই কথা। তাই যদি হয় তবে ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক সহ ইসলামের দৃষ্টিতে যারা অপরাধী তাদের অপরাধের জন্য তারা কেউই দায়ী না। আবার যদি তাদের অপরাধের জন্য তাদেরকে দায়ী করা হয় তবে আল্লাহ কোরআনে যা কিছু লিখে রেখেছেন সেটি কার্যকর থাকে না। কারণ, হয়তো দেখা যাবে গোপাল দত্ত নামের জনৈক হিন্দু ব্যক্তি মূর্তি পূজা করছেন যেটি ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এটা আগে থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছিলেন। আল্লাহ যা লিখেছেন সেটা হতেই হবে – এটাই ইসলামের বিধান। সুতরাং গোপাল দত্তের কোন দোষ নেই। আবার যদি গোপাল দত্ত দোষী হয় তবে আল্লাহ ব্যাপারটা লিখে রাখেননি। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ লিখে রেখেছিলেন বলে ইসলামের গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায় সুতরাং গোপাল দত্ত নির্দোষ। সমস্ত দোষ আল্লাহর।
মুসলমান-অমুসলমান প্রসঙ্গ না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু এই যে মুসলমানেরই দুটি হাতের মধ্যে একটি হাত মুসলমান এবং আরেকটি হাত কাফের হয়ে বসে আছে এটা কে করেছে? আল্লাহ? আল্লাহ কেন ডান হাতকে সম্মান দিলেন আর বাম হাতকে অসম্মান দিলেন? বাম হাতের অপরাধটা কি? আল্লাহ কি ডান হাত এবং বাম হাতের ঈমানের পরীক্ষা নিচ্ছেন? এই পরীক্ষায় ডানহাত পাশ করলে সে জান্নাতে যাবে, আর বাম হাত জাহান্নামে যাবে। কিন্তু যদি উল্টোটা হয়? যদি ডান হাত ফেল করে এবং বামহাত পাশ করে? তবে কি বাম হাত জান্নাতে যাবে? বাম হাত জান্নাতে গেলে আল্লাহ যে ডানহাতকে অধিক সম্মান দিলেন সেই ব্যাপারটা মার খেয়ে যাবে না? আবার যদি আল্লাহ ডান হাতকে সম্মানিত হাত হিসেবেই নির্ধারণ করে রাখেন তাহলে এটা কি বৈষম্য করা হলো না? মুসলমানদের যে ধর্মটা মুসলমানদের প্রত্যেক মুসলমানের দুই হাতের মধ্যেই এত বৈষম্য করতে পারে সে ধর্মটা জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রে কি পরিমাণ বৈষম্য করতে পারে বলে আপনার ধারণা? হ্যাঁ, সত্যি বলতে, আপনি যা ধারণা করছেন তারচেয়েও বহুগুণ বেশি বৈষম্য করছে ইসলাম। আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি। আপনার ধারণার চেয়েও বেশি।