Mfti Masud
(সাইফুল বাতেন টিটোর লেখা বই {বাংলাদেশে নিষিদ্ধ} বিষফোঁড়ার জন্য একটি ভূমিকা লিখেছিলাম। সেটিই এখানে তুলে ধরলাম পাঠকদের জন্য)।
একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক, তখন আমি ঢাকার আনোয়ারুল উলুম মাদরাসার ছাত্র। বয়স কত হবে, ১৪ কিংবা ১৫। পাশে বসা ক্লাসমেটের সাথে কথা বলছিলাম, কার লেখায় যেন পড়েছি “সব মানুষকে ভালোবাসতে হয়, সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি।” ক্লাস চলাকালীন কথা বলতে দেখে আমার হুজুর (মাদ্রাসায় শিক্ষককে হুজুর বলা হয়) আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোরা কি কথা বলছিস? আমার ক্লাসমেট বলল, মাসুদ বলেছে দুনিয়ার সব মানুষকে ভালোবাসতে হয়। হুজুর আমাদের বললেন, না, সব মানুষের মধ্যে তো কাফের-মোশরেকও আছে, ওদেরকে তো ভালোবাসা যাবেনা! হুজুর বলে চললেন, আল্লাহ কেবল মুসলমানদের ভালোবাসতে আদেশ করেছেন, আর কাফেরদেরকে ঘৃণা করতে বলেছেন। ইমাম সাহেবের ছেলে হওয়ার কারণে এবং শৈশব থেকেই এক ধর্মীয় গন্ডির মধ্যে বড় হতে হতে আমার মধ্যে আল্লাহর প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস এবং ভয় জন্মেছিল। আল্লাহ যা বলেছেন তা মেনে নেয়ার আগ্রহ ছিল, যেটা সচরাচর মুসলিম সন্তানদের মধ্যে হয়ে থাকে। সুতরাং মনের মধ্যে সব মানুষকে ভালোবাসার বাসনা থাকলেও আমি সেদিন থেকে কেবল মুসলিমদের ভালোবাসতে চেষ্টা করলাম, কারণ এটি আল্লাহর নির্দেশ। একইসাথে অমুসলিমদের ঘৃণা করার চেষ্টা করলাম, কারণ এটাও আল্লাহর নির্দেশ! না, পারা যায় না, আমি যখন গ্রামের বাড়িতে গেলাম আর খেলার সাথীদের মধ্যে যখন সবচেয়ে ভদ্র ও মিষ্টভাষী ছেলেটিকে খুঁজে পেলাম সে হিন্দু তখন মনের সাথে বোঝাপড়া শুরু হল। আমার শিক্ষকের হুজুরের নির্দেশ মোতাবেক তাকে ঘৃণা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারা গেল না। খেলা শেষ করে আমি তার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। সে স্কুলে পড়ে। সে ‘থাকব নাক বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগতটাকে’ এই কবিতা পড়ে। সে বাংলা পড়ে। ইংরেজি পড়ে, অংক শেখে। আমি কেবল আরবি আর উর্দু পড়ি। আমি কোরআন শিখি, হাদিস শিখি, আর নবিজীর গল্প শুনি। কোরআনের সূরা আল ফাতহ এর মধ্যে মোহাম্মদের অনুসারীদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, তাঁরা “কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল”। মাদ্রাসায় আমাদের প্রচলিত সংগীত শুনতে দেয়া হতো না, কারণ ইসলামে যেকোনো ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শোনা কিংবা প্রেম ভালোবাসার কবিতা আবৃত্তি করা কিংবা শোনা সবকিছুই হারাম। আমার আলোচনা মূলত কওমি মাদ্রাসাকে নিয়ে। আলিয়া মাদ্রাসা বা সরকারি মাদ্রাসা আমার আলোচ্য নয়। বিষফোঁড়া বইয়ের গল্পটিও কওমি মাদ্রাসাকে ঘিরেই। আলিয়া মাদ্রাসার সাথে কওমি মাদ্রাসার মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। আলিয়া মাদ্রাসায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যসূচি রয়েছে, সরকারি অর্থায়ন আছে, এবং রয়েছে সরকারের কাছে জবাবদিহিও। সাধারণত আলিয়া মাদ্রাসায় আবাসিক থাকার বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু কওমি মাদ্রাসা ঠিক এর বিপরীত। সরকারের কোনো সাহায্য সহযোগিতা এখানে নেই। সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কওমি মাদ্রাসা নির্মাণ এবং এর অর্থায়নের সাথে জড়িত। সুতরাং এ মাদ্রাসার সাথে সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও সমাজের সাধারণ মুসলিম থেকে শুরু করে বিশিষ্ট মুসলিম সবাই এখানে হয়ে ওঠে সরকার, যে সরকারকে খুশি রাখতে হয় মাদ্রাসার হুজুরদের।
দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর অফিসার, বউ পেটোয়া আম পাবলিক স্থানীয়ভাবে সরকার হতে চায়, ক্ষমতা দেখাতে চায়; এবং সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে তাঁরা সততার প্রলেপ দিয়ে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে চায়। এসব কিছুর জন্য সহজ ও সস্তা উপায় হচ্ছে মসজিদ বা মাদ্রাসা বানানো। মাদ্রাসা বানালে একদল ‘ভাড়াটে হুজুর’ পাওয়া যাবে যারা মাদ্রাসা নির্মাতার চরিত্রকে পবিত্র আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করবে, মাদ্রাসার সভাপতি, সেক্রেটারি এবং তাদের চৌদ্দ নারী-পুরুষকে বেহেশতে (স্বর্গে) পাঠাবে, আর এসবের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান তো রয়েছেই। এই সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কোন হিন্দু বা ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে ইসলাম ও নবী অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে নিরাপত্তাহীন করে তার জমিজমা ও সহায়-সম্বল প্রভাবশালীদের পাইয়ে দেয়া। আরও রয়েছে প্রভাবশালীদের আক্রোশের শিকার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা। এর বিনিময়ে রাতের অন্ধকারে হুজুরের পকেটে লভ্যাংশের লামছাম অংশ ঢোকে।
কওমি মাদ্রাসাগুলি কেবল কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না, বরং এগুলিকে বলা যেতে পারে মিনি ইসলামিক স্টেট। এই মিনি ইসলামিক স্টেট সম্পর্কে মানুষ জানেনা এটা যেমন সত্য তারচেয়েও বড় সত্য হচ্ছে তাঁরা জানতে চায় না। অনেকে আবার মাদ্রাসার হুজুরদের (শিক্ষকদের) ইসলামপন্থী ভেবে ভুল করেন। আমার মনে আছে নাইন ইলেভেনের পর নিউজ উইক সম্পাদক ফরিদ জাকারিয়া বলেছিলেন, ইসলামপন্থী মানেই জিহাদি নয়। জাকারিয়া ঠিকই বলেছেন, ইসলামপন্থী মানেই জিহাদি নয়, বরং ইসলামপন্থীরা তো জিহাদিদেরই সৃষ্টিকর্তা। আমি মাদ্রাসায় কোন ইসলামপন্থীকে দেখিনি, বরং সেখানে আমি জ্যান্ত ইসলাম দেখেছি। ইসলামপন্থীদের তো দেখেছি টেলিভিশনে, সংবাদ মাধ্যমে, রাজনীতিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইসলামপন্থীরা মাদ্রাসা বানায়, আম পাবলিক আর লিবারেল মুসলিমরা মাদ্রাসা বানায় যেখানে মুসলিম শিশুদের ব্রেইনওয়াশ করার মাধ্যমে ‘ইসলাম’ বানিয়ে ফেলা হয়। মানুষ কি ইসলাম হতে পারে? মানুষ কি সুন্দর না হয়ে সৌন্দর্য হতে পারে? আমরা কি বলতে পারি, মেয়েটি কি সৌন্দর্য? হ্যাঁ হতে পারে। আমার মতে, কেউ যদি সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক হয় তবে সে সুন্দর থেকে সৌন্দর্য হতে পারে, ঠিক মাদ্রাসায় পড়া শিশুটিও ইসলামের এতটাই বাহক যে, সে স্বয়ং ইসলাম হয়ে ওঠে, সে জীবন্ত বোমা হয়ে ওঠে। আমি বাংলাদেশে দেখেছি, মুসলিমদের সমাজে যারা তুলনামূলক লিবারেল, যারা তুলনামূলক ভালো ইসলামের কথা বলে, যারা মোল্লাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করার দ্বারা প্রগতিশীলতার শিলান্যাস করে তাঁরাই আবার মসজিদ এবং মাদ্রাসায় গিয়ে বলে ‘শরিয়া আইনেই আমাদের রাষ্ট্র চলা উচিত, কিন্তু কি করব বলুন সারা দুনিয়া চালাচ্ছে ইহুদি-নাসারার দল তাই ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে বা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকাশ্যে শরিয়ার কথা বলা যায় না, একটু দাড়িটা কেটেকুটে রাখতে হয়’। ওই যে লিবারেল মুসলিম বা ইসলামপন্থী মুসলিম ওরাই কিন্তু আমাদেরকে দাড়ি কাটার অনুমতি দেয়নি, আমাদের সামনে রুদ্ধ করে রেখেছিল সিনেমা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রাঙ্কন এসব কিছুই। আমাদের বানাতে চেয়েছিল চৌদ্দশ বছরের পেছনের বর্বর মানুষ। বর্বর হয়েছে, অনেকে হয়েছে, এখনও হচ্ছে, কিন্তু আমি হতে চাইনি। আমি বর্বর হওয়ার, ওদের হাতের পুতুল হওয়ার, ওদের চরিত্রের এবং বেহেশতের ঠিকাদার হওয়ার হুকুম পালন করিনি বলে আজ নিজ দেশে প্রত্যাখ্যাত, পরদেশে নির্বাসিত।
কওমি মাদ্রাসাকে আমি বলতে চাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘ইনস্টিটিউশনালাইজড রেপ ইন্ডাস্ট্রি’, ধর্ষণ যেখানে ‘আয়োজিত’ কিন্তু স্বীকৃত নয়। কেন আয়োজিত কিন্তু স্বীকৃত না সেটি বুঝতে হলে আপনি একবার কল্পনা করুন মাদ্রাসার ভেতরকার দৃশ্য – শিক্ষক নামের একজনকে সেখানে রাখা হয় যার ভূমিকা মূলত কারারক্ষীদের মতোই। মাদ্রাসার বন্দিশালা থেকে যাতে ছাত্ররা বের হতে না পারে, তারা যেন সবসময় সেখানে আটকে থাকে এটি নিশ্চিত করা শিক্ষকের দায়িত্ব। এর পাশাপাশি তিনি মাদ্রাসাকে একটি মিনি ইসলামিক স্টেট হিসেবে প্রস্তুত রাখেন যেখানে ইসলামের আইন কানুন চলে। হ্যাঁ, মাদ্রাসায় চুরি করলে হাত কেটে ফেলা হয় না, কিন্তু চুরি করলে যে হাত কেটে ফেলতে হয় সেই শিক্ষাটা সেখানে দেয়া হয়। সেখানে একজন ছাত্রের উপর সারাক্ষণ নজর রাখা হয় যেন ছাত্রটি কোনোভাবেই, কোনোভাবেই ইসলামের নির্দেশিত কোন বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক এমন কিছু না করে। ছাত্রদেরকে নামাজ পড়ার নিয়ম, রোজা রাখার নিয়ম, জিহাদ করার নিয়ম গনিমতের মাল (জিহাদের মাধ্যমে অমুসলিমদের কাছ থেকে অর্জিত বা ছিনিয়ে নেয়া সম্পদকে ইসলামের পরিভাষায় গনিমতের মাল বলে) বন্টন করার নিয়ম শিক্ষা দেয়া হয়। এর পাশাপাশি ঘুমানোর দোয়া (প্রার্থনা), স্নানের দোয়া, টয়লেটে প্রবেশের দোয়া, টয়লেট থেকে বেরোনোর দোয়া, খাওয়ার আগের এবং পরের দোয়া ইত্যাদি আরো বহু কাজেরই দোয়া শেখানো হয়। এমনকি স্ত্রী সহবাসেরও দোয়া আছে, সেটিও মাদ্রাসায় আমাদেরকে শেখানো হয়েছে। মাদ্রাসা যেহেতু আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে থাকা এক ‘মিনি ইসলামিক স্টেট’ সেহেতু এখানে ইসলামের কোন সমালোচনা, কোরআনের কোন বিষয়ের কোন সমালোচনা, ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদের ন্যূনতম কোন কাজ নিয়ে আপত্তি বরদাশ্ত করা হয় না। ইসলামের আইন অনুসারে, মোহাম্মদ, কোরআন ও আল্লাহকে নিয়ে যেকোনো সমালোচনাকারীর একমাত্র শাস্তি শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যু নিশ্চিত করা। আর তাই মাদ্রাসাগুলোতে ইসলাম নিয়ে, নবী নিয়ে, কোরআন নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যায় না। সেখানে যুক্তি ও প্রশ্নের কোন সুযগ নেই, যা আছে, যা শেখানো হয় সেটি কেবল বিশ্বাস। এই বিশ্বাস ভয়ঙ্কর, এই বিশ্বাস অন্ধ। প্রায় সব কওমি মাদ্রাসায়ই ছাত্র এবং ছাত্রীদের আবাসিক থাকতে হয়। কওমি মাদ্রাসাকে আবাসিক স্কুলের মতো ভাবলে কিন্তু আপনি ভুল করবেন। সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মধ্যযুগীয় সংস্কার আর রয়েছে কঠোর শরিয়া নজরদারি। শিক্ষকেরা সেখানে যখন তখন যেকোন ছাত্রের যেকোনো কিছুর ব্যাপারে নজরদারি করতে পারে। চাইলে বিছানা চেক করতে পারে, চাইলে পকেট চেক করতে পারে, চাইলে ট্রাঙ্ক চেক করতে পারে। প্রাইভেসি বলতে সেখানে ছাত্রদের কিছুই থাকেনা, নিজস্বতা বলতেও কিছু থাকেনা। সকল কিছু ইসলাম দিয়ে ঘেরা। চারিপাশে ইসলাম। চারিদিকে ইসলাম। মুসলিম সমাজের কথিত সুশীলেরা ওদের মধ্যে পূর্ণ ইসলাম দেখতে চায়, জিহাদের উপর অবিচল আস্থা দেখতে চায়। মাদ্রাসার ছাত্ররা সকাল থেকে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা থেকে সকাল সিসিটিভি ক্যামেরার মতই তাদের হুজুরদের দুটি শরিয়া চোখের নজরদারিতে থাকে। আবার হুজুররাও সমাজের অন্যদের বে-শরা চোখের শরিয়া নজরদারিতে থাকে। অর্থাৎ যারা ব্যক্তিজীবনে শরিয়া আইন মেনে চলছে না তাঁরাও হুজুররা যেন ১০০% শরিয়া মেনে চলে সেজন্য তাদেরকে কড়া নজরদারিতে রাখে।
ছাত্ররা সবাই সেখানে ফ্লোরে ঘুমায় এবং প্রত্যেকে পাশাপাশি ঘুমায়। একই ক্লাসে ছোট শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, এমনকি যুবক ছেলে পর্যন্ত পড়াশোনা করে। কখনও কখনও দুই ক্লাসমেটের বয়সের ব্যবধান দ্বিগুণ-তিনগুণও হয়ে যায়, অর্থাৎ সেখানে বয়সের কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই যে কারণে ক্লাসমেটদের মধ্যে বৈষম্য থাকে। একই শ্রেণিতে কেউ বড় ভাই, কেউ ছোট ভাই। আমি যখন মাদ্রাসায় পড়েছি তখন আমার দ্বিগুণ বয়সী কামরুলকে আমি কামরুল ভাই ডাকতাম, আপনি আপনি করে ডাকতাম, আর কামরুল আমাকে ডাকতেন তুই তুই করে এবং অবশ্যই নাম ধরে। ঠিক একইভাবে আমার ক্লাসমেট এনামুল হাসানকে আমি আপনি আপনি এবং এনামুল ভাই বলে ডাকতাম, আর তিনি আমাকে মাসুদ ও তুই তুই করে ডাকতেন। সুতরাং এরকম জায়গায় বড় ক্লাসমেট কর্তৃক ছোট ক্লাসমেট ধর্ষিত হওয়া যেমন খুব সাধারণ ব্যাপার। ঠিক একইভাবে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র ধর্ষিত হওয়াটাও স্বাভাবিক ব্যাপার। কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকদেরকে ছাত্রদের উপরে অত্যধিক ক্ষমতা দেয়া হয়। শিক্ষকরা ছাত্রদের যেকোন আদেশ করলে সেটা ছাত্রটি মানতে বাধ্য। এখানে সুবিধাজনক হাদিস ও বড় হুজুরদের বাণী তো রয়েছেই – ওস্তাদের কথা শুনলে আল্লাহ খুশি হবেন, হুজুরকে খুশি করলে এলেম (বিদ্যা) অর্জন করা যাবে, হুজুরের সাথে বেয়াদবি করলে আল্লাহর গজব (অভিশাপ) বর্ষিত হবে ইত্যাদি ধর্ষণ-বান্ধব কথা কত হাজারবার যে শুনেছি তার কোন পরিসংখ্যান নেই! ইনফ্যাক্ট প্রত্যেকটা কওমি মাদ্রাসার ছাত্র এমন কথা শুনতে শুনতেই বড় হয়, বুড়ো হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। এমন কথা বলতে বলতেই মাদ্রাসার প্রতিটি হুজুর বুড়ো হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। অপরদিকে যেসব মা-বাবা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় দেন তাদের মানসিকতাও ধর্ষণ-বান্ধব। খুবই লোভী দুশ্চরিত্র টাইপের লোকেরাই তাদের সন্তানকে মাদ্রাসায় দেন। ওঁদের লোভের পরিধি এত বেশি যে, ওঁরা জীবদ্দশায় ছেলে রোজগার করে মা-বাবা, ভাইবোন সবাইকে খাওয়াবে এমন আশা তো করেই মৃত্যুর পরেও ছেলের মাধ্যমে বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ওঁদের লোভ দেখানো হয়, তোমার ছেলে যদি মাদ্রাসায় পড়ে তাহলে তুমি যে দুনিয়ায় যত পাপ করছ তা মোচন হয়ে যাবে, তোমার বেহেশত আর কেউ আটকাতে পারবেনা। লোভী মা-বাবা লোভে পড়ে যান এবং সন্তানকে মাদ্রাসায় দেন। সন্তানকে মাদ্রাসায় দেয়ার সময় মা-বাবা আবার নসিহত করেন সে যেন হুজুরের সব কথা মান্য করে, হুজুরের খেদমত (সেবা) করে। হুজুররাও আছে – তাঁরা আবার অভিভাবকদের বলে রাখে, “আপনার ছেলে হুজুরের বিরুদ্ধে কিছু বললে বিশ্বাস করবেন না, ওসব শয়তানের ষড়যন্ত্র, শয়তান চায় না আপনার ছেলে হাফেজ হোক, শয়তান চায় আপনার ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে ছুটিয়ে নিতে।“ এদিকে আবার যারা মাদ্রাসা নির্মাণ এবং পরিচালনা করে তারাও মাদ্রাসার ভেতরকার খবর নিতে যায় না এবং খবর নিতে চায় না। খবর নিতে চায় না কেন? কারণ তারা জানে এর ভেতরে কি হয়। জেনেও না জানার ভান করে থাকতে চায়, কারণ মাদ্রাসার এই কুশিক্ষিত হুজুরগুলি ওদের রাজনীতিতে এবং ব্যবসায় বেশ কাজে লাগে। সমাজে প্রভাব বিস্তারে কাজে লাগে। কালিমালিপ্ত চরিত্রকে ধবধবে সাদা করতেও কাজে লাগে। রাজনীতিতে অশিক্ষিতের চেয়ে কুশিক্ষিতের মুল্য ঢের বেশি। কুশিক্ষিত এবং অনাহারী এই মাদ্রাসার হুজুরদের চাইলেই খরচ করে ফেলা যায়, মাদ্রাসার ছাত্রদের খরচ করে ফেলা যায়। যখন খরচ করার দরকার হয় না এদেরকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে রাখা হয়। কখনো-সখনো প্রয়োজন হলে বা বিদেশি বন্ধুদেরকে নিজেদের প্রগতিশীলতা দেখানোর জন্য মাদ্রাসার হুজুরদের কাঠমোল্লা বলে গালিও দেয়া হয়। জেনে রাখা ভালো, যারা মাদ্রাসার হুজুরদের কাঠমোল্লা বলে গালি দেয় তারা মূলত মাদ্রাসারই সৃষ্টিকর্তা। বদ পিতা যেমন নিজের সন্তানকে বদমাশ, ইবলিশ এসব বলে ‘আদুরে গালি’ দেয় ঠিক মাদ্রাসার সৃষ্টিকর্তা ওই ভদ্রলোকেরাও মাদ্রাসার ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত তাদের নিজস্ব প্রডাক্টগুলিকেও কাঠমোল্লা বলে গালি দেয়। সুতরাং মাদ্রাসার এই পরিবেশকে আমি ধর্ষণ-বান্ধব পরিবেশ, মাদ্রাসায় সন্তান পাঠানো মা-বাবাদের আমি ধর্ষণ-বান্ধব মা-বাবা এবং মাদ্রাসাকে ইন্সতটিটিউশনালাইজড রেপ ইন্ডাস্ট্রি বলতে চাই।
মানুষের বিনোদনের কত উপায় আছে, মানুষের সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার বিকাশের কত সুযোগ রয়েছে; এই সুযোগ যেমন অমুসলিমদের রয়েছে, এই সুযোগ যেমন নাস্তিকদের রয়েছে তেমনিভাবে এই সুযোগ রয়েছে মডারেট মুসলিমদেরও। আর সেজন্যই তো আমি যখন আমার শৈশবে দেখতাম বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসায় চিত্রাংকন করা সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) অথচ বাংলাদেশেরই স্কুলে একই সময়ে চিত্রাংকন শেখানো হচ্ছে! আমি অবাক হতাম বৈকি। একই দেশের মাদ্রাসার মুসলিম ছাত্র আর স্কুলের মুসলিম ছাত্রের শিক্ষায় ও পোশাকে, বই ও সিলেবাসে, বিদ্যালয় ও শিক্ষকের মধ্যে কি বিপুল তফাত! আমরা মাদ্রাসার ছাত্ররা ছবি আঁকলে পাপ হয়, গান শুনলে পাপ হয়, টিভি দেখলে পাপ হয়, প্যান্টশার্ট পরলে পাপ হয় কিন্তু স্কুলের ছাত্ররা ছবি আঁকলে, গান শুনলে, টিভি দেখলে, প্যান্টশার্ট পরলে পাপ হয় না? একই দেশে, একই সমাজে কেন এই বৈষম্য? যারা স্কুলে পড়ে তাদের পাপ ধুয়েমুছে বেহেশতে নেব আমরা, কিন্তু আমরাই যদি বিপদে পড়ি? আমাদের পাপ ধুয়েমুছে আমাদেরকে কি ওই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বেহেশতে নিতে পারবে? যদি না পারে তবে ওদেরকে বেহেশতে নেয়ার মতো এতবড় দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আমরা কি পাচ্ছি? সামান্য বেতন আর কাঠমোল্লা গালি?
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকেরা সাধারণত নিজেদের এলাকায় বা নিজেদের গ্রামের মাদ্রাসায় চাকরি না করে দূরবর্তী এলাকায় বা দূরবর্তী গ্রামের মাদ্রাসায় চাকরি করেন। কওমি হুজুরদের তাদের মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে রাতে এবং দিনে পাহারা পাহারা দেয়ার জন্য এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে নিজের পরিবারকে কাছে না রেখে রাখতে হয় অনেক দূরে বা গ্রামের বাড়িতে। এই মানুষগুলির বিনোদনের সুযোগ নেই, স্ত্রীও কাছে নেই, অন্যদিকে তাদের যেকোনো হুকুম তামিল করার জন্য সদা প্রস্তুত রয়েছে ছাত্ররা। এমতাবস্থায় একজন হুজুর কি করবে? তার সামনে বিনোদনের যে পথটি খোলা থাকে সেটি হচ্ছে রাতের অন্ধকারে কোন এক শিশুকে বিছানায় ডেকে নিয়ে জৈবিক লালসা চরিতার্থ করা। ধর্ষণ করলে হুজুর যতটুকু নিন্দিত হবেন তারচেয়েও বেশি নিন্দিত হবেন যদি তিনি রবীন্দ্র সংগীত শোনেন, যদি নজরুল সংগীত শোনেন, যদি তিনি বলিউড কিংবা হলিউডের সিনেমা দেখেন কিংবা যদি তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই পড়েন। আজকের যে হুজুরটি তাঁর মনোবিকাশের কোনো সুযোগই কোনদিন পাননি, নিজেও তার শৈশবে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, চারিদিক থেকে কাঠমোল্লা গালি শুনেছেন, সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশতেও পারেননি, সংগীত ও শিল্প এসব কোনকিছুর সাথে পরিচিত হননি, কেবল পরিচিত হয়েছেন কোরআন-হাদিস, জিহাদ ও গনিমতের মাল এসব কিছুর সাথে তিনি কিভাবে সুস্থ চিন্তা করতে পারেন? তিনি কিভাবে দেশ ও জাতিকে কিছু দিতে পারেন? এ তো অসম্ভব ব্যাপার। নিম গাছ লাগিয়ে সেখান থেকে কি হিমসাগর আমের আশা করা যায়? পার্থেনিয়াম চাষ করে সেখান থেকে কি হাসনাহেনা ফুল আশা করা যায়?
ফরিদ জাকারিয়া যাদেরকে জঙ্গি বলতে অস্বীকার করেছেন বা পাশ্চাত্যকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, ওরা জঙ্গি না তারা আসলেই জঙ্গি না; তারা আসলে জঙ্গিদেরই সৃষ্টিকর্তা। তারা মাদ্রাসার নির্মাণকর্তা এবং মাদ্রাসার পালনকর্তা। ওঁদের সেবাযত্নে তৈরি হওয়া মাদ্রাসার হুজুররা ভারতীয় দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুকরণে একেকজন হয়ে ওঠে ইসলামের বোমা – এক জ্যান্ত ইসলাম। ওরা ধ্বংস করতে শেখে, ধ্বংস করতে চায় আর ধ্বংসের মধ্যেই বেহেশত খুঁজে পায়। ওদের পাঠ্যপুস্তকে তাইই লেখা আছে। আমি মাদ্রাসায় তাইই পড়েছি। তালেবান ও জইশ-এ মোহাম্মদের জিহাদিরাও মাদ্রাসায় তাইই পড়েছে। ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা ও এর যত শাখা-প্রশাখা তথা কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে রয়েছে তাঁরা সবাই এই শিক্ষাই পায়। আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা এদের প্রতিহত করার জন্য বহুবিধ নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরি করেছে, বহুবিধ অস্ত্র বানিয়েছে তাই তাদের ঠেকানোও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু কতদিন? আফগানিস্তান কি ওদের হাতে যায়নি? সভ্যরা আবার মুসলিম সমাজের মধ্যে একদলকে আদর করে মডারেট মুসলিম বলে তাদেরকে দিয়ে জ্যান্ত ইসলাম তথা মাদ্রাসার হুজুরদের অবদমিত রাখে। আর তাই, বাংলাদেশ থেকে যখন কওমি মাদ্রাসার হুজুররা ভারতের অভিমুখে লংমার্চ ডাকে বা ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেয় তখন বাংলাদেশের সরকার তাদেরকে আটকে দেয়, বাংলাদেশের পুলিশ তাদের গতিরোধ করে। কিন্তু আদতে কি ওই মডারেট মুসলিম বা মুসলিম শাসকগোষ্ঠী শান্তি চায়, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান চায়? এর উত্তর হচ্ছে, না।
ব্যাপারটা অনেকটা উত্তর কোরিয়ার শাসকের অবস্থানের সাথে তুলনাযোগ্য। কিম জং উন পারমাণবিক বোমা বানিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে দরকষাকষিতে যাচ্ছেন – এই এই সুবিধা দিলে, জনগণের উপর দমনপীড়নে বাঁধা না দিলে আমরা পরমাণু বোমা বৃদ্ধি স্থগিত করতে প্রস্তুত। বিশ্ব সম্প্রদায় ওদের সাথে দরকষাকষিতে যায়। মডারেট মুসলিম তথা মাদ্রাসার সৃষ্টিকর্তারাও কিমের মতই মাদ্রাসা সৃষ্টি করে সেখানে জ্যান্ত মানববোমা তৈরি করে যারা কেবল জিহাদ করে শহীদ হতে চায়। মরলে শহীদ, এবং ৭২ খানা পরমা সুন্দরী হুর, আর বাঁচলে গনিমতের মাল (যেখানে ‘কাফেরদের মেয়েরাও’ থাকবে) জুটবে। যে জীবনে সঙ্গীত নেই, যে জীবনে নৃত্য নেই, যে জীবনে শিল্প ও সাহিত্য নেই, যে জীবনে মানুষকে ভালবাসার সুযোগ নেই সে জীবন রেখে লাভ কি? এমন জীবন রাখার চাইতে মাদ্রাসার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তাদের সাহায্য নিয়ে যদি জিহাদ করে সাথে সাথে বেহেশতে যাওয়া যায় তবে মন্দ কি?
মাদ্রাসা নামক বদ্ধ কারাগারের বন্দিদেরকে (হুজুর ও ছাত্র) রূপকথার দৈত্যের সাথেও তুলনা করা যেতে পারে। দৈত্যকে বোতলবন্দী করা হয়। বোতলের মুখ খুলে ছেড়ে দিতেই দৈত্য দানবীয় আকার ধারণ করে এবং “কি হুকুম হুজুর?” – হাঁক দেয়। মাদ্রাসার হুজুররা তাদের সৃষ্টিকর্তাদের নির্দেশে মাদ্রাসা নামক বোতলঘরে বন্দি থাকে, আবার স্রষ্টারা উস্কানি দিলেই বা বোতল থেকে বেরোতে বললেই ওরা উস্কে যায় এবং তান্ডব চালায়। তখন নাস্তিকদের বিরুদ্ধে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ওরা রাস্তায় নামে, ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই বলে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে। কেউ অশিক্ষিত থাকলে তাকে নিয়ে ভয় ততটা নেই, শিক্ষার আলো তার মধ্যে প্রবেশ করার বা প্রবেশ করানোর সুযোগ রয়েছে কিন্তু যে কুশিক্ষিত তাকে কিভাবে শিক্ষিত করা যাবে? অশিক্ষা ক্ষতিকর, কিন্তু কুশিক্ষা? সে যে হন্তারক!
মাদ্রাসার সৃষ্টিকর্তারা হয়তো আমার লেখা এই ভূমিকার এ পর্যন্ত পড়ে রেগেমেগে আগুন হয়ে যাবেন। ভুরু কুঁচকে বলবেন, মাদ্রাসায় সঙ্গীত শেখানো হয় না এটা সর্বৈব মিথ্যা কথা। হ্যাঁ, মাদ্রাসায় সঙ্গীত শেখানো হয় তা এক হিসেবে ঠিক, কিন্তু ইসলামে যেহেতু সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র হারাম তাই সেসব সঙ্গীতে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হয় না। মাদ্রাসায় শেখানো হয় কেবল হামদ (আল্লাহর প্রশংসা) ও নাতে রাসুল (মোহাম্মদের প্রশংসা) সম্বলিত সংগীত। মাদ্রাসার পরিভাষায় এই ইসলামিক সঙ্গীতকে গজল বলা হয়। আমিও গজল শিখেছিলাম সেই শিশুকালে। শিশুকালে শেখা সেই গজলের যতটুকু মনে আছে তাঁর মাত্র দু’চারটের নমুনা দিচ্ছিঃ ১) অস্ত্র হাতে নাও মুজাহিদ অস্ত্র হাতে নাও / ঘুরে ঘুরে হত্যা করো কাফের যত পাও ২) জিহাদের এই ঝান্ডা আমরা চিরদিন উঁচু রাখব / চির মুজাহিদ সৈনিক মোরা অতন্দ্র নিশি জাগব ৩) তালেবান তালেবান তালেবান, ধেয়ে আসছে ওই তালেবান / যাদের ভয়ে আজ বাতিল সবে পেরেশান। আশা করি এ তিনটি সংগীতের প্রথম দুটি লাইন থেকেই কি ধরনের সঙ্গীত আমরা মাদ্রাসায় শিখেছি, কি ধরনের বিনোদনের মধ্য দিয়ে মাদ্রাসার একটি শিশুর শৈশব এবং কৈশোরকে নিয়ে যাওয়া হয় সে সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। যেকোন মডারেট মুসলিমের কাছে মাদ্রাসা কেন সৃষ্টি করা হয় এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে বলবে, নীতিবান মানুষ তৈরির জন্যই তাঁরা মাদ্রাসা বানায় বা বানিয়েছে। আসলে নৈতিক মানুষ না, বরং সাচ্চা মুসলমান বানানোর ফ্যাক্টরি হিসেবেই মাদ্রাসার সৃষ্টি এবং মাদ্রাসার হুজুরদের জন্মদান করা হয়। আমরা খুব শৈশবেই মাদ্রাসায় হাদিস (মোহাম্মদের মুখের বাণী) মুখস্ত করেছিলাম, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন করবে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন। আর তাই মাদ্রাসার বন্দিশালায় ব্রেইনওয়াশড একজন মানুষ সারাজীবন মুসলিমের দোষ গোপন করে, আর অমুসলিমের দোষ খুঁজে বেড়ায়। মুসলিম ঘুষখোর অফিসার, মুসলিম দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, মুসলিম সন্ত্রাসী রাজনীতিবিদ সবার দোষই আড়াল করার জন্য ‘হাদিস পড়া’ হুজুররা বেশ কাজের। ইসলামে অমুসলিমের দোষ খুঁজে বেড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু মুসলিমের দোষ খুঁজে বেড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইসলামে অমুসলিমদের ঘৃণা করায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু মুসলিমদের ঘৃণা করায় নিষেধাজ্ঞা আছে। ইসলামে অমুসলিমকে কষ্ট দেয়ায় কোন নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু মুসলিমকে কষ্ট দেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। ইসলামে মুসলিমদের সাথে সদাচরণ করতে ও অমুসলিমদের প্রতি কঠোর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোরআনের বহু আয়াতে এমন নির্দেশনা রয়েছে। মুসলিমদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি আর অমুসলিমদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে স্বয়ং ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহর মুখনিঃসৃত বাণী কোরআনের মধ্যেই। মুসলিমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা আর অমুসলিমকে শত্রুরূপে গণ্য করা এটিও কোরআনেরই নির্দেশ। কোরআনের আল্লাহ নিজেই অমুসলিমদেরকে তার নিজের এবং মুসলিমদের জন্য শত্রু আখ্যা দিয়েছেন। কওমি মাদ্রাসা যেহেতু ইসলামপন্থী দল এবং মডারেট মুসলিমদের আদরে গড়া ইসলামিক দূর্গ, যেহেতু এখানে প্রকৃত ইসলাম নিখুঁতভাবে শিক্ষাদান এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বাস্তবায়ন করা শেখানো হয় সেহেতু কোরআনের নীতিকথায় (?) পূর্ণ আয়াত, মোহাম্মদের মুখের বাণী আর মোহাম্মদের জীবনের গল্প সমূহ পড়লে একজন মানুষ কতটা নৈতিক হতে পারবে বলে আপনি মনে করছেন? আজ বাংলাদেশ জুড়ে মাদ্রাসা শিক্ষার যত প্রসার হচ্ছে সমাজে সাম্প্রদায়িক হিংসাও তত বাড়ছে। মাদ্রাসার স্রষ্টারা হিংসার উৎস কোথায় তা জানে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই ওরাই গোলটেবিল বৈঠকে বা টিভি টকশোয় বসে দেশটা কেন রসাতলে যাচ্ছে তাই নিয়ে মার্ক্স, ফুকো, কান্ট ও জাক লাকাঁর কথা কোট করে নিজেদের বিদ্যা জাহির করেন কিন্তু মাদ্রাসা নিয়ে টুঁ শব্দটিও করেননা। ফুকো, কান্ট ও জাক লাকাঁর মূল্যবান বাণীর আড়ালে চাপা পড়ে যায় মাদ্রাসার গল্প, চাপা পড়ে যায় মাদ্রাসার শিশুদের আহাজারির কথা, চাপা পড়ে যায় তাদের কথা যাদেরকে বন্দি করে ব্রেইনওয়াশ করার মাধ্যমে সমাজের আবর্জনা হিসেবে এবং ভিক্ষার ঝুলি ধরিয়ে ‘বোধ-প্রতিবন্ধী’ রূপে বড় করা হয়। আড়ালে রাখা হয় পৃথিবীর জঘন্যতম বদ্ধ কারার কথা। চৌদ্দশ বছর আগের বর্বর যুগের বর্বরতায় বাস করা মানুষ এই আধুনিক সময়কে কি দিতে পারবে? তাঁরা যে কুবিদ্যা শেখে তার বাইরের কোন বিদ্যা কি তাঁরা দেশ ও সমাজকে উপহার দিতে পারবে? কাফেরদের ঘৃণা করলে আল্লাহ খুশি হন এমন কথা পাঠ্যপুস্তকে পড়ার পর একজন মানুষ কিভাবে মানবিক বোধসম্পন্ন বা অসাম্প্রদায়িক হতে পারবে?
সুতরাং হে পাঠক, আপনি যদি শোনেন বাংলাদেশে আবারো কোন হিন্দু মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে, আবারো কোন হিন্দুপাড়ায় মসজিদের মুসুল্লিরা তান্ডব চালিয়েছে তবে দয়া করে অবাক হবেন না। বরং বলতে শিখুন, যা হওয়ার কথা ছিল তাইই হয়েছে।
অনেকে বাংলাদেশ এবং ভারতে দিনদিন বাড়তে থাকা মৌলবাদ নিয়ে চিন্তিত। তাঁরা বলতে চান, আগে এমন অবস্থা ছিল না। আগে নাকি সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ভালো ছিল, মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ছিল, অসহিষ্ণুতাও কম ছিল। আমার কিন্তু এমনটা মনে হয় না। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগেও বনু কুরাইযা গোত্রের লোকদের উপর গণহত্যা পরিচালিত হয়েছিল ইসলামের জন্যই। এখন থেকে ৭৫ বছর আগে ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয়েছিল ধর্মের নামেই। এই সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছিল মৌলবাদীদের নেতা সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক মাদ্রাসার হুজুর ও মসজিদের ইমামদের উস্কে দিয়ে তাদের মাধ্যমে মসজিদের মুসল্লিদের ক্ষিপ্ত করে তাদের দিয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি করার মাধ্যমে। এর আগে ও পরে বহুবার সোহরাওয়ার্দীর পূর্বসূরি এবং উত্তরসূরিরা মাদ্রাসায় পড়ুয়া এই চৌদ্দশ বছরের পুরনো ধ্যানধারণার মানুষগুলিকে দিয়ে দাঙ্গা করিয়েছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক উত্তরসুরিরা মাদ্রাসায় মোল্লা উৎপাদন করে তাদের খরচ করেন, কিন্তু তাঁরা মৌলবাদী নন! মৌলবাদী হচ্ছে মাদ্রাসায় পড়া ওই হুজুরগুলি! আজও চলছে এর ধারাবাহিকতা। আজও রাজনৈতিক দলের সাম্প্রদায়িক লোকগুলো অনলাইন এবং অফলাইনে হুজুর ও তাদের অনুগামী মুসুল্লিদের উস্কানি দিয়ে বেড়ায়। এসব ‘উস্কানিযজ্ঞে’ ভারত, আমেরিকা, ইসরায়েল, ইহুদি-নাসারা, কাফের-মোশরেক, বেদাতি, বে-শরা এই শব্দগুলি হচ্ছে কী-ওয়ার্ড। এসব শব্দবন্ধ এবং তা দিয়ে রচিত ষড়যন্ত্রের থিওরি মুসলিমদের কানে দিতে পারলেই কেল্লাফতে – তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে মুসলিম নারীপুরুষ! মিছিলে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। আল্লাহুআকবার স্লোগান দিয়ে মিছিল থেকে হামলা হয় হিন্দু, বৌদ্ধ এমনকি ইসলামের অনুসারী আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের উপরেও। এসব মিছিলের সবচেয়ে কমন স্লোগান হচ্ছে “ইসলামের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান!” এই যে মিছিলে ইসলামের শত্রুদের হুঁশিয়ার সাবধান করা ওটি মাদ্রাসারই শিক্ষা। মাদ্রাসায়ই শেখানো হয়, ইসলামের বিরুদ্ধে কাফেররা গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এমনকি যখন মাদ্রাসার হুজুর তার ছাত্রকে ধর্ষণ করেন তখনও তিনি তার ছাত্রকে স্মরন করিয়ে দেন যে, কাফের-মোশরেক ও নাস্তিক-মুরতাদেরা ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এটি একজন বিশ্বাসী মুসলিমের বিশ্বাসেরই অংশ। এই বিশ্বাসকে মাঝেমাঝে জাগিয়ে তুলতে হয়, মুসুল্লি ও তৌহিদী জনতাকে উত্তেজিত রাখতে হয়, এতে লাভজনক ব্যবসা ও সাফল্যপূর্ণ রাজনীতি হয়। ইসলাম খাতরা মে হ্যায়, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অমুক অমুক দেশে গণহত্যা চলছে এমন কথা বলানোর জন্যই, এমন প্রোপাগান্ডা সারাক্ষণ করানোর জন্যই মাদ্রাসার জন্ম দেয়া হয়। মাদ্রাসায় যা শেখানো হয় তা একটি শিশুর মনের কথা হতে পারে না। মাদ্রাসায় যা শেখানো হয় তা একটি সুস্থ মস্তিস্কের মানুষের পছন্দের হতে পারে না। আর তাই মাদ্রাসাকে পৃথিবীর অন্য সকল ইনস্টিটিউট, অন্য সমাজ, অন্য ধর্ম, ভিন্নমত ও ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখা হয়। শিশুকাল থেকেই মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেদেরকে আবাসিক মাদ্রাসায় আবাসিক থাকতে হয়। চলনে-বলনে, শয়নে ও স্বপনে ইসলাম ও এর অনুভূতির চর্চা করতে হয়। যে শিশুটি সমাজের অন্য সবার সাথে মিশবে, যে শিশুটি প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাবে আর বিকালে স্কুল থেকে ফিরে মা-বাবার স্নেহের পরশ পাবে সে শিশুর পক্ষে এত অমানবিক হওয়া, অমানবিকতার কথাবার্তা মেনে নেয়া দুঃসাধ্য। আর সেজন্যই মাদ্রাসা পড়ুয়া প্রতিটি শিশুকে মায়ের আদর থেকে, বাবার স্নেহ থেকে দূরে রাখা হয়, সার্বক্ষণিকভাবে মাদ্রাসার হুজুরের তদারকিতে মাদ্রাসার বদ্ধ জগতে বোতলবন্দি রাখা হয়। যে শিশুটি মাদ্রাসায় পড়তে চায় না তার উপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। মুসলিম দেশে এই শিশুটির কাঁদার, কথা বলার, প্রতিবাদ করার কোন জায়গা নেই। মডারেট মুসলিমরা চায়, এই শিশুটি ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, বিশ্বাস করে হোক আর বিশ্বাস না করেই হোক যেকোনো মূল্যে ইসলামের সেবক হয়ে উঠুক। যেকোনো মূল্যে সমাজের অন্য ওদের বেহেশতে নেয়ার ঠিকাদার হয়ে উঠুক, যেকোনো মূল্যে রাজনীতির ক্যানন ফোডার হয়ে উঠুক, যেকোনো মূল্যে সে ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধির কারণ হয়ে উঠুক, যেকোনো মূল্যে সে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণবাদী ও আধিপত্যবাদীদের ব্যবহার করার উপযুক্ত মানব অস্ত্র হয়ে উঠুক। আগে খুব সুন্দর দিন ছিল, আর এখন নষ্ট হয়ে গেছে আমি একথা মানিনা। মাদ্রাসায় আগে ভালো শিক্ষা দেয়া হতো, এখন সাম্প্রদায়িক শিক্ষা হয়ে গেছে এমনটা ঘটেনি। আমি মাদ্রাসার জেলখানায় বন্দি থাকাকালে দেখেছি, আমাদের মধ্যে যারা মাদ্রাসায় পড়তে চাইত না (প্রায় কেউই মাদ্রাসায় পড়তে চাইত না) তাদের উপরে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হতো। এখন রাষ্ট্রসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং দেশীয় আইনের কারণে, ক্যামেরার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণে মাদ্রাসায় শিশুদের উপর শারীরিক নির্যাতন মনে হয় একটু কমই হয়। তবে মানসিক নির্যাতন এবং ধর্ষণ কমেনি। আগে যারা মাদ্রাসা থেকে পালাত তাদের পায়ে শেকল পরানো থাকত। আমি যতগুলি মাদ্রাসায় পড়েছি সেখানে দেখেছি বহু ছাত্রের পায়ে লোহার শেকল পরানো।
আপনি কি এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে পারেন যেখানে শিক্ষার্থীদের পায়ে জেলখানার কয়েদিদের মতো লোহার শেকলে বাঁধা ডান্ডাবেরি পরানো রয়েছে? খাওয়া, ঘুম, স্নান, নামাজ, ক্লাসে বসা সবকিছুতেই সবসময়ে একজন ছাত্রকে পায়ে শেকল বহন করে চলতে হয়েছে। কেন? কারণ, ইসলাম খাতরা মে হ্যায়, ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে তাই ইসলামকে বাঁচাতে হবে! ইসলামকে বাঁচাতে হলে ওকে হুজুর বানাতে হবে, ওকে মোল্লা বানিয়ে সমাজের ভদ্রলোকদের বেহেশত যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাদের বেহেশতের দরকার নেই তাদেরকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে হবে। এখনো কিছু মাদ্রাসায় এই ডান্ডাবেরি পরানোর দৃশ্য দেখা যায়, তবে আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আমাদের সময়ে এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমাদের সময়ে পুলিশ কোনদিনই ছাত্রকে বেধড়ক পেটানোর কারণে কোন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশ কোনদিনই ছাত্রকে ধর্ষণ করার জন্য কোন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেনি। হ্যাঁ, তবে ছাত্রকে খুন করে ফেললে কদাচিৎ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন এসব কিছুকে ‘জীনের কাজ’ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে, এবং এখনও হচ্ছে। আমার শিশুকালেরও আগের সময়ে মানে আমার বাবাদের যুগে – আমার বাবা যিনি মাদ্রাসায় পড়েছেন – তখন বর্বরতার মাত্রা ছিল আরো বেশি। তখন মাদ্রাসায় অত্যাচারের মাত্রা ছিল আরো বেশি। তখন ছাত্রদের পায়ে শেকল পরানোর ব্যাপারটা ছিল আরো বেশি স্বাভাবিক, ধর্ষণও ছিল আজকের মতোই, সুতরাং কখনো যদি কেউ বলেন আগে ভালো দিন ছিল, আগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল তবে আমি তার সাথে একমত হতে পারব না একবিন্দুও। আজ থেকে ১০০ বছর আগের কওমি মাদ্রাসায়ও আল হিদায়াহ বই পড়ানো হয়েছে যেখানে বলা আছে, কাফেররা আমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু না করলেও আমাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া। কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তকেই লেখা আছে, কিভাবে কাফেরদের কচুকাটা করতে হয়, কিভাবে তাদের মেয়েদেরকে গনিমতের মাল হিসেবে দখল এবং ধর্ষণ করতে হয়, কিভাবে তাদের শিশুদেরকে দাস বানাতে হয় এবং ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে হয়।
আমি কি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মাদ্রাসার কথা বলছি? না। মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয় এমন একটি দেশ ভারত, সেখানেরও তো একই চিত্র। যেখানেই মুসলিমরা আলাদা সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে সেখানেই বাংলাদেশের মতোই একই চিত্র দেখতে পাওয়া যায় – সেখানে অসংখ্য মাদ্রাসা তৈরি হয়, এসব মাদ্রাসায় শিশুদের উপরে আয়োজন করে নির্যাতন ও ধর্ষণ চলে যেমনটা চলে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে। সেসব মাদ্রাসায়ও একইভাবে রাজনীতি চলে যেমনটা চলে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মাদ্রাসায়। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো এসব মাদ্রাসা নিয়ে স্পিকটি নট থাকে, মিডিয়াকেও মাদ্রাসা ও মসজিদ নিয়ে খামোশ করে রাখে। গল্প ওখানের যা এখানেরও তা। সবকিছুই ইসলামের জন্য, রাজনীতিবিদদের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য; সবকিছুই ‘জনপ্রিয়তাবাদী’ বুদ্ধিজীবীদের জন্য এবং চরিত্রহীন সমাজপতিদের জন্য। আর তাই বাংলাদেশে যেমন মাদ্রাসার ভেতরকার নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে রাখা হয় ভারতেও একইভাবে এবং একই কারণে তাই হয়। বাংলাদেশের পত্রিকায় মাঝেমাঝে মাদ্রাসার ভেতরকার ধর্ষণযজ্ঞ নিয়ে লেখালেখি হয়, ভারতে তাও হয় না। কারণ, এসব নিয়ে লিখলে সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাহত হয়! সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের মুসলিম সমাজের যে মুসলিম নেতা মাদ্রাসা বানিয়েছেন তার কাছ থেকে যে একচ্ছত্র দাবি – আপনার পুরো এলাকার সবগুলো ভোট আমার রাজনৈতিক দলকে দেবেন যেন – সে ব্যাপারটা একটু গোলমেলে হয়ে যায়। ভোটের ক্ষেত্রে ভোটবাদীরা গোলমাল পছন্দ করেন না। ভোটবাদীরা ‘ভেতরে কি হচ্ছে সেসব জানব না, আমার কেবল ভোট লাগবে’ এই থিউরি পছন্দ করেন, এই নীতিতে তারা চলেন।
যেকোনো নিষ্ঠুরতা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে সমাজে কত প্রতিবাদ হয়, আন্দোলন হয় কিন্তু মাদ্রাসায় যুগ যুগ ধরে চলমান ধর্ষণ ও নির্যাতন নিয়ে কোন কথা হয়না। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে যে শিশুমন ও মননের উপর নির্মম গণহত্যা চলছে সেটিকে না থামিয়ে বরং ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনিতি-পাল্টা রাজনীতি চলছে। সাংবাদিক, সমাজকর্মী, পশুপ্রেমী, পরিবেশকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি ও সাহিত্যিক সবার চোখ এড়িয়ে যায় কওমি মাদ্রাসা। নাটকে, সিনেমায়, গল্পে, উপন্যাসে, ইসলাম সম্পর্কে কত বার্তা তুলে ধরা হয়, আযানের দৃশ্য দেখানো হয়, নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চেয়ে বলিউড নায়ক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছেন এমন দৃশ্য পাওয়া যায় কিন্তু যেটা পাওয়া যায় না সেটি হচ্ছে ইসলামের দুর্গ বা জেলখানা মাদ্রাসা সম্পর্কে ন্যূনতম কোন বার্তা। ভারতে তো বটেই, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেরও ঐ একই চিত্র। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ আর হাল জমানায় শাহাদাত রাসএলের ‘কালার অফ চাইল্ডহুড’ ছাড়া আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কর্ম হয়নি মাদ্রাসা নিয়ে। তরুণ লেখক সাইফুল বাতেন টিটো ছাড়া আর কোন লেখকের বইয়ে কওমি মাদ্রাসা নিয়ে কোন কিছু লেখা হয়নি। হ্যাঁ, হয়েছে, কিন্তু তা কেবল মাদ্রাসার শিক্ষকদের দ্বারা লিখিত। মাদ্রাসার ভেতরকার নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা আর নোংরামি সাইফুল বাতেন টিটো ছাড়া আর কোন লেখকই তাঁর বইয়ে তুলে ধরেননি। এমন প্রয়োজনীয় ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজ করার জন্য লেখককে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। এমন একটি বইয়ের ভূমিকা লিখতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। বইটি লিখতে গিয়ে লেখক বহু মাদ্রাসায় ঘুরেছেন, বহু ছাত্র ও শিক্ষকদের সাথে কথা বলেছেন। লেখক যখন আমাকে বললেন, তিনি মাদ্রাসার ভেতরকার ধর্ষণ ও নিপীড়ন নিয়ে বই লিখতে চলেছেন জানতে পেরেও কোন হুজুর বা ছাত্রই তার উপর চড়াও হয়নি, বরং গোপনে বাহবা দিয়েছেন তখন আমি নিশ্চিত হয়েছি লেখক একবিন্দু মিথ্যা বলেননি, তিনি সত্যিই অনেক মাদ্রাসায় ঘুরেছেন এবং তথ্য জোগাড় করেছেন। কারণ, আমি কওমি মাদ্রাসায় পড়েছি এবং পড়িয়েছি তাই ওদের মন-মানসিকতাও জানি।
বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যত রয়েছে মাদ্রাসার সংখ্যা তারচে বেশি ছাড়া কম নয়। ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলেও যত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যায় মাদ্রাসার সংখ্যা তারচে বেশিই পাওয়া যায়, অথচ এই মাদ্রাসা নিয়ে সমাজ আশ্চর্যজনকভাবে নিরব! কেন এই নিরবতা, কেন আড়াল করা হয় মাদ্রাসার নিষ্ঠুরতা সে এক বড় প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত পৌছবে না, পৌছাতে দেয়া হবে না, কর্তৃপক্ষও এটি চান না।
যহেতু আমার জীবনের বিশাল এক সময় কেটেছে কওমি মাদ্রাসায় সেহেতু পাঠগ্রহণ এবং পাঠদান এসবই আমার কওমি মাদ্রাসাকে আবর্তন করেই। সুতরাং নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা যেমন আমার আছে তেমনি আছে ছাত্রদের উপর নিষ্ঠুর হওয়ার বাধ্যবাধকতার অভিজ্ঞতাও। প্রথম কথাটা আপনারা মেনে নিতে পারলেও ‘নিষ্ঠুর হওয়ার বাধ্যবাধকতা’ কথাটা হয়ত আপনাদের কানে লাগছে, কিংবা হৃদয়ে বিঁধছে, অথবা আপনাদেরকে আশ্চর্যান্বিত করছে। জেনে রাখা ভালো, নিষ্ঠুর হতে বাধ্য করলেও সবাই বাধ্য হয়ে যায় না, সবাই নিষ্ঠুর হয়ে যায় না। জিহাদী হতে বাধ্য করলেই সবাই জিহাদী হয়ে যায় না – এর উদাহরণ আমি নিজে। এর উদাহরণ কওমি মাদ্রাসার হাজারো পড়ুয়া যারা এখন মসজিদের ইমাম কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, কিন্তু তারা জিহাদ করছে না। মনে মনে তাঁরা ইসলাম ও জিহাদ পছন্দ করছে না, কিন্তু সমাজের ‘মডারেট মুসলিমদের’ ভয়ে, নিরাপত্তার কারণে এবং অর্থনৈতিক কারণে তারা সেসব কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না। এর কারণও আছে, জিহাদ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ (আবশ্যকীয়) বিধান। কোরআনে নামাজের কথা বলা হয়েছে ৮২ বার, কিন্তু অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, তাদের সাথে বন্ধুত্ব না করা তাদেরকে সবসময় শত্রুর চোখে দেখার নির্দেশনা এসেছে সহস্রাধিক বার। ভারতবর্ষের প্রায় সব কওমি মাদ্রাসায় ‘সহীহ হানাফি ইসলাম’ শেখানো হয় যেখানে জিহাদের উপস্থিতি অসম্ভব রকমের বেশি। আর তাই এই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেই মাসুদ আজহার, হাফিজ সাঈদের মতো মানুষ তৈরি হয়েছে। এসব মাদ্রাসা থেকেই আফগানিস্তানে তালেবান তৈরি হয়েছে। ওরাই আজকের আফগানিস্তান পরিচালনা করছে। তালেবানকে আপনি গালাগাল করতে পারেন, কিন্তু তালেবানেরও অতীতটা দেখুন – একদল মাদ্রাসার নিপীড়িত, ধর্ষিত, সুশিক্ষা-বঞ্চিত ছাত্র আফগানিস্তানের আধুনিক মুসলিমদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মাদ্রাসার জন্য ভিক্ষা চাইছে। একদল আফগান মানুষ ওদের প্রত সহানুভূতি দেখাচ্ছে, আরেকদল ওদের পশ্চাদপদ বলে দূর দূর করছে। কিন্তু যারা দূর দূর করছে তাঁরাই কিছুদিন পর ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় মাদ্রাসা-মসজিদে ঘুরঘুর করে, ইসলাম ও মাদ্রাসা নিয়ে আবেগঝরা বক্তব্য দিয়ে মিডিয়া ছাড়ার ঘোষণা দিচ্ছে। যে অভিনেত্রী ও অভিনেতারা আগে হুজুরদের দেখে ছেই ছেই করত তাঁরা এখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভিনয় ছাড়ার কথা বলছে। আফগান তালেবান কি করেছে? তাঁরা এই ভণ্ডামোর অবসান ঘটিয়েছে। “আমরা পাপ করি আর তোমরা মোল্লা হয়ে আমাদের পাপ মোচন করে বেহেশতে পাঠাও” মডারেট মুসলিমদের এমন আব্দারকে তালেবান রুখে দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের তালেবানও এমনটিই আশা করে। তারাও একসময় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার স্বপ্ন দেখে। তারাও মনে করে, তাদের আফগান তালেবান তথা দেওবন্দী হুজুররা যখন পেরেছে তখন আমরাও পারব।
১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাকেই দক্ষিণ এশিয়ার সব কওমি মাদ্রাসার হেডকোয়ার্টার ধরা হয়। দেওবন্দ কেবল মাদ্রাসাই না, এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনও বটে। দেওবন্দের শিক্ষা ও সিলেবাস অনুসরণ করেই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামিক শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। ঘৃণাকে যদি আমি বিষের সাথে তুলনা করি – এবং অবশ্যই তা বিষের সাথে তুলনাযোগ্য – একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মাদ্রাসায় একটি শিশুর মস্তিষ্কে যে পরিমাণ ঘৃণা ঢালা হয় সেটি যদি জাপান কিংবা নরওয়ের একটি স্কুলছাত্রের মস্তিষ্কে ঢালা হয় তবে নির্ঘাত সে মারা যাবে! তাহলে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিশুরা মরছে না কেন? এর উত্তর হচ্ছে, যে শিশুদের কওমি মাদ্রাসায় দেয়া হয় তাদের মা-বাবার কাছ থেকেও অনেকটাই সেই আচরণ পেয়ে অভ্যস্ত যে আচরণ তারা পরবর্তীতে মাদ্রাসায় পেয়ে থাকে। তাদের মায়েরা সাধারণত বাবার তাবেদার, পশ্চাতপদ ও ‘দুঃখিনী মা’ হয়। তাদের বাবা প্রচন্ড ধর্মভীরু এবং লোভী হয়। প্রচন্ড লোভ না থাকলে কিভাবে একজন বাবার পক্ষে নিজের নিরপরাধ সন্তানকে পৃথিবীর জঘন্যতম কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব হয়?
মাদ্রাসায় প্রত্যেকটা শিশু যে নিষ্ঠুরতার শিকার হয় সেটি সমাজ কর্তৃক আরোপিত নিষ্ঠুরতা। মাদ্রাসায় যে ধর্ষণযজ্ঞ চলে তা সমাজ কর্তৃক আয়োজিত ধর্ষণ। মাদ্রাসার যে শিক্ষক তার ছাত্র বা ছাত্রীকে ধর্ষণ করে বা নির্যাতন করে হত্যা করে ফেলে এটিও সমাজ কর্তৃক আয়োজিত। আয়োজিত বলেই এটা নিয়ে কোথাও টুঁ শব্দটি করা যাবে না। কারণ, আয়োজক যে অনেকেই! আবার আয়োজকরা মোল্লা বলে পরিচিতও না, তাঁরা ভালো মুসলিম বলে পরিচিত। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা মুসলিম বুদ্ধিজীবী বলেও পরিচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা মুসলিম বলেই পরিচিত না।
একবার মাদ্রাসায় ঢুকলে সমাজের অন্য সবাই তাকে ভিন্ন চোখে দেখে। সে অসহায়, সে পশ্চাৎপদ, কিন্তু সে সৎ মানুষ। সে সন্ন্যাসী, কিন্তু সন্ত্রাসবাদী (জিহাদী)। তার ধর্মীয় অনুভূতি আহত হলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে, চিৎকার করে, পারলে খুন করে। সমাজের অন্যরা এ কথা জানে। শুধুই জানেই না, এটা করার জন্যই তাকে তাঁরা সৃষ্টি করেছে। যত দোষ নন্দঘোষের হোক বা না হোক, মুসলিম সমাজে যত দোষ মোল্লা ঘোষের। তাঁকে সৃষ্টি করা হয়, অপরাধপ্রবণ করা হয় এবং ব্যবহার করা হয়। সভ্য সমাজের কাছে, দেশের কাছে তাঁকে কখনো ভিলেন কখনো নায়ক রুপে তুলে ধরা হয়, আবার তাঁকে দিয়ে অন্যদের ভয়ও দেখানো হয়। একবার মাদ্রাসায় ঢুকলে সমাজের অন্য সবাই (মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে) তাকে ভিন্ন চোখে দেখে। সে অসহায়, সে পশ্চাৎপদ, কিন্তু সে সৎ মানুষ। সে সন্ন্যাসী, কিন্তু সন্ত্রাসবাদী (জিহাদী)। সমাজের অন্যরা এ কথা জানে। জানে, কারণ তার একে সন্ত্রাসবাদী বানাচ্ছে। আর এই মাদ্রাসায় পড়ুয়া সন্ত্রাসবাদী যে গান শোনে না, নাটক-সিনেমা দেখেনা, গল্প-উপন্যাস পড়ে না, বিজ্ঞান সম্পর্কে জানেনা তার দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের বাকিদের বেহেশত নিশ্চিত করা। লোকেরা মডারেট মুসলিম নামে একদল নরমপন্থী মুসলিম আবিষ্কার করেছে জানি। নরমপন্থীরা নাকি ভালো মুসলিম! আসলে আমি ঐ ভালো মুসলিম বা খারাপ মুসলিম কারো পক্ষে বা বিপক্ষে নই, আমি মানুষ ও মানবতার পক্ষে, কিন্তু ভদ্রলোকেরা মানুক চাই না মানুক আমি মডারেট মুসলিমদেরকে জিহাদী মুসলিমদের সৃষ্টিকর্তা মনে করি।
এতক্ষণ অনেক হতাশার কথা শুনলেন, কিন্তু দূরে কোথায় যেন মিটিমিটি আলো জ্বলছে। আমি আলো দেখতে পাচ্ছি। একসময় মাদ্রাসা নামক এই জেলখানা বন্ধ হবে। একসময় শিশুরা হাসবে, খেলবে, ছবি আঁকবে, গান গাইবে, কবিতা লিখবে। একসময় তরুণ-তরুণী একসাথে আড্ডা দেবে, প্রেম করবে এবং নিজেদের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বাছাই করবে। একসময় মানুষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে লাইব্রেরিতে যাবে। একসময় মানুষ তার ধর্মীয় অনুভূতি আহত হওয়ার কারণে হিংস্র হয়ে যাবে না, অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। মাদ্রাসার ভেতরে থাকা অনেকেই বুঝতে শুরু করেছে যে, তারা আসলেই নিপীড়িত। এমনকি যে হুজুর জিহাদের শিক্ষা গ্রহণ করেছে, জিহাদি ধ্যান-ধারণা নিয়ে বড় হয়েছে সেও এখন বুঝতে শিখছে। সেও বুঝতে শিখছে যে, তাকে ফলে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ব্যবহার করা হচ্ছে। নারী অধিকার নিয়ে যেমন অনেক নারী যেমন সোচ্চার হয়েছে ঠিক তেমন মাদ্রাসার কারাগারে পিছিয়ে রাখা হুজুররাও একসময় তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হবে। নারীরা তাদের নারীত্ব মুছে ফেলতে চাইছে না, কারণ এটি শরীরতন্ত্রের বৈচিত্র। মাদ্রাসা পড়ুয়ারা একসময় তাদের মাদরাসা শিক্ষাকে মুছে ফেলতে চাইবে, কারণ এটি শারীরতন্ত্রীয় কোন বিষয় নয়; এটি আরোপিত, এটি চাপানো। বেশি দূরে নয় সেদিন যেদিন ওরা বুঝবে, মডারেট মুসলিমরা এবং তাদের সহযোগী রাজনীতিবিদেরা ওদেরকে নারীবিদ্বেষ শিখিয়ে নারীদেরই কেবল বন্দি করছে না, বরং বন্দি করছে ওদেরকেও। নারীরা না হয় মাথায় হিজাব পরে, কিন্তু নারীর হিজাবের ফতোয়াদাতা মাদ্রাসার হুজুরও কেন মাথায় হিজাব (লোকে সৌদি রুমাল বলে) পরে? নারীরা না হয় কালো বোরকা বোরকা পরে – এবং হুজুরকে দিয়ে নারীদের কালো বোরকা পরাতে বাধ্য করা হয় – কিন্তু ওই হুজুররাও কেন জোব্বা (যা প্রায় বোরকার মতোই) পরিধান করে? তার মানে অন্যকে ঠকাতে গিয়ে হুজুররা নিজেরাই ঠকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক নারীই জীবনের কোন না কোন সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়, কিন্তু মাদ্রাসার হুজুররা? তারা কি রক্ষা পাচ্ছে? বরং দেখা যাবে, স্কুল-কলেজে পড়া মেয়েরা যত না ধর্ষণের শিকার হয় তারচেয়ে অনেক বেশি অনেক বেশি ধর্ষণের শিকার হয় মাদ্রাসার হুজুররা। নারীকে ধর্ষণ করতে গিয়ে বা নারীকে ধর্ষণ করার শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে তারা নিজেরাই বারবার ধর্ষিত হচ্ছে। আর নিপীড়ন, অপমান আর লাঞ্ছনা সেটা যে কত বেশি, কত ভয়ানক, কত যাতনাদায়ক তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে। আমিও জেনেছি; আর তাই আমি মাদ্রাসার হুজুরদের, নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়ে লিখছি। আমি আশা করছি, বিষফোঁড়া উপন্যাসটি হয়ে উঠবে সমাজের দর্পণ। এটি থেকে অনুপ্রাণিত হোক আরও অনেক লেখক, আরও অনেক ঔপন্যাসিক। সাইফুল বাতেন টিটোর জন্য আবারো শুভকামনা। তিনি যে সাহসী কাজটি করেছেন এবং সেজন্য মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছেন আর তার বইটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছে বলেই বইটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। মানুষের মুক্তি হোক, জুলুমের অবসান ঘটুক, পৃথিবীর বৃহত্তম ইনস্টিটিউশনালাইজড রেপ ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হোক এই কামনায়।
আবদুল্লাহ আল মাসুদ।
