হামেদ আব্দুল সামাদ
সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফ্যাসিবাদ ও ইসলামপন্থা
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ একটি রাজনৈতিক ধর্ম (Religion)। এর অনুসারীরা বিশ্বাস করে তারাই চুড়ান্ত সত্যের অধিকারী, যে সত্যের মহামহিম অভ্রান্ত নেতা সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে পবিত্রতার বলে বলীয়ান হয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করবেন। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ তার অনুসারীদের ঘৃণা এবং হিংসায় দূষিত করে তোলে, পৃথিবীকে ভাগ করে বন্ধু ও শত্রুতে, এবং যারা এর বিরোধিতা করে তাদের উপর কঠিন প্রতিশোধ নেয়। এটি বিরোধিতা করে আধুনিকতার, সভ্য মূল্যবোধের, মার্ক্সবাদের এবং ইহুদীদের; অথচ গৌরবান্বিত করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাকে এবং আত্মত্যাগকে—এমনকি ফ্যাসিবাদের পথে শহীদ হওয়াকে।
আধুনিক ইসলামপন্থা এই সকল বৈশিষ্ট্যই বহন করে, যদিও ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ঘটেছিল ১৯২০ দশকে। এ দুটি মতাদর্শ- ইসলামপন্থা এবং ফ্যাসিবাদ এর উৎপত্তি হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালি এবং জার্মানির পরাজয়ের বেদনাবোধ থেকে এবং অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর মুসলিমদের অপমানিত হওয়ার বোধ থেকে। ইসলামপন্থা এবং ফ্যাসিবাদকে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যেমন একটি প্রবল প্রতিপত্তিসম্পন্ন সাম্রাজ্য তৈরি করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দুনিয়াজুড়ে প্রভাব বিস্তার করার স্বপ্ন, এবং একইসাথে তাদের শত্রুদের দমন করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে আকাঙ্ক্ষা তাদের বিশ্বাস করায় যে, তাদের শত্রুদের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। একটি আন্দোলন বিশ্বাস করে নিজ মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্বে, আর অন্যটি বিশ্বাস করে মানবজাতির বিরাট এক অংশের [অর্থাৎ অমুসলিমদের] উপর তাদের ইসলামিক চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বে।

বেনিটো মুসোলিনি যখন ইটালিতে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন, তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের গৌরবময় দিন ফিরিয়ে আনার। সম্রাট জুলিয়াস সিজার কর্তৃক অর্ধ পৃথিবী শাসন করার সময়কার সেই গৌরব। মুসোলিনির উথ্থানের অল্প কয়েক বছর পরেই, হাসান আল-বান্না (Hassan al-Banna) ঠিক একই ধরণের ইচ্ছা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন মুসলিম ব্রাদারহুড, সেইসঙ্গে উসকে দিলেন নবী মহম্মদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার সেই গৌরবময় স্মৃতিকে যার সীমানা বিস্তৃত হয়েছিল অর্ধ পৃথিবী পর্যন্ত। তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত ফ্রান্সের লেখক আবদেল ওয়াহাব মেদ্দেব (Abdelwahab Meddeb) তার “ইসলামের রোগ”বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, ইসলামি বিশ্বের প্রধান সমস্যা হলো মধ্যযুগে তাদের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল সেটির পতন হওয়াকে তারা মেনে নিতে পারছে না। তারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটও ফিরে পাচ্ছে না, কিন্তু সবসময়ই সেটা ফিরে পাওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষা করে, এবং সবসময়ই তারা দুনিয়াকে শাসন করার স্বপ্ন দেখে। এমন ভাবনা, মুসলিমরা যে গৌরবোজ্জল অতীত নিয়ে গর্ববোধ করে তার আর আজকের দিনের কষ্টদায়ক ও হতাশাজনক বর্তমানের মধ্যে, সুস্পষ্ট বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। আর এটি সেই পাশ্চাত্যের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করে যারা শ্রেষ্ঠত্বের আসন দখল করেছে, অথচ পৃথিবীর প্রকৃত সেরা জাতি- যাদেরকে মানুষের কল্যাণে তৈরি করা হয়েছে (অর্থাৎ মুসলিম)- তাদের বদলে ওরাই আজ পৃথিবীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এভাবেই ঘৃণা আক্ষরিক রূপ লাভ করে যেমনটি বলেছেন ফ্রেডরিক নিৎসে, ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এমন একদল লোকের থেকে যারা নিজেদেরকে তাদের আশপাশের এবং জগতের অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। মেদ্দেবের মতে, এ এক দীর্ঘস্থায়ী অসুখ যার উৎপত্তি হয়েছে ইতিহাস এবং পৃথিবীর দ্বারা প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি থেকে। এক আদর্শবাদী অতীতের সাথে মিলে এই অসুখ সৃষ্টি করেছে ইসলামি ফ্যাসিবাদের অন্যতম চালিকা শক্তিকে। এরই ফলশ্রুতিতে প্রত্যেক ইসলামিক আন্দোলন তার বক্তব্যের মধ্যে অসহায় মানুষের কথা আর পৃথিবীকে শাসন করার স্বপ্নের কথা বারবার তুলে ধরে।
ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক লক্ষণ
ইতালীয় দার্শনিক, প্রাচীন লিপির অর্থ উদ্ধারকারী ও শিক্ষাবিদ আম্বারতো ইকো তার বই Five moral pieces বইয়ে ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক অবস্থার চৌদ্দটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। যার মধ্যে একটি হচ্ছে “প্রথার উপাসনা করা”। আর এই প্রথার উপাসনা ফ্যাসিবাদীকে মনে করায় যে, সত্য হচ্ছে স্থির ও অপরিবর্তনীয় বিষয়। আর এর মাধ্যমে তারা বৌদ্ধিক অগ্রগতির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয় এবং সত্য জানার জন্য সংশয়, গবেষণা ও পরীক্ষণ প্রক্রিয়াকেও তাঁরা নাকচ করে দেয়। ফ্যাসিবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সত্য হচ্ছে এমন জিনিস যার ওপর জাতির লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে স্বাধীন চিন্তা কিংবা পড়াশোনা করা ব্যতিরেকেই।
প্রথার পূজা করা ইসলামি চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে যা কিছু জানার তার সবই আছে অমোঘ, অলঙ্ঘনীয় কোরআনে। কোরআনের মধ্যে মানুষের যতটা জ্ঞানের প্রয়োজন তার সবটুকুই রয়েছে। এমনকি ইসলামের দ্বিতীয় সারির কিতাব যেমন সুন্নাহ, তাফসীর ও চার মাজহাবের জুরিসপ্রুডেন্স এসব কিছুকেও পবিত্র মনে করা হয়; এবং তাতেও হাত দেয়া নিষিদ্ধ মনে করা হয়। রাজনৈতিক ইসলাম মনে করে তার লক্ষ্য স্বর্গীয়, এ এমন এক আহ্বান যার ডাকে সাড়া দিতে হবে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে, যে কোন সময়ে বা স্থানে। যারা ইসলামি বক্তব্যকে সময়ের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করে, সালাফি এবং জিহাদিরা উভয়েই তাদেরকে খারাপ এবং ভয়ানক আখ্যা দেয়; তারা বিশ্বাস করে পরিবর্তনশীল ও সসীম মানুষের পক্ষে চিরন্তন ও অসীম আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভবপর নয়। তারা ভাবে না, যে মুসলিম কোরআনের বাণীকে আক্ষরিক অর্থে নেয়, জীবনে চলার পথে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল আধুনিক পৃথিবীর সাথে মানিয়ে চলতে তাকে বিপরীতমুখী পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে হয়। একজন ইসলামপন্থীর দৃষ্টিতে মানুষ হচ্ছে ঐশীবাণী ও ইসলামী শরীয়ার সেবাদাস। ইসলামপন্থীদের মতে, মানুষ আধুনিকতার পেছনে যত ছুটবে সে তত বেশি প্রকৃত ঈমান (ইসলামের প্রতি বিশ্বাস) থেকে দূরে সরে যাবে। আর ইকোর মতে, আধুনিকতা এবং এনলাইটেনমেন্ট প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টাই ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক কিন্তু চূড়ান্ত রূপ। এই প্রত্যাখ্যান যেন মজবুতভাবে বাঁধা রয়েছে এক পশ্চাদমুখী মূর্খতায়, যৌক্তিক সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে, বিদেশীদের ঘৃণা করা, যৌনতা এবং পৌরুষত্বের অহঙ্কার। এটি তো জানা কথা যে, রাজনৈতিক ইসলামের সবচেয়ে অগ্রাধিকার হচ্ছে আধুনিকতার বিরুদ্ধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুদ্ধ করা, এবং এটি নিয়ে তারা গর্ববোধও করে।
ইকো লিখেছেন, ফ্যাসিবাদ বেঁচে থাকে এক সংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসের উপর যে “অন্যেরা” তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। অত্যাচারী মানসিকতার সঙ্গে মিশে থাকে অপমানজনক প্রতারণার স্থির বিশ্বাস এবং প্রতিশোধের সীমাহীন তৃষ্ণা। আর ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এধরনের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের ভাবনাচিন্তার মধ্যেই। আর এজন্যই ইসলামের নবী মুসলিমদের সতর্ক করেছেন অবিশ্বাসী, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের থেকে এবং তিনি সংবাদ দিয়েছেন যে, অন্যান্য জাতির সবাই ক্ষুধার্ত কুকুরের ন্যায় মুসলিমদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে অচিরেই। ইকোর মতে ফ্যাসিবাদের অনুসারীরা যতটা বাঁচার জন্য যুদ্ধ করে তার থেকে বেশী বেঁচে থাকে আরও যুদ্ধ করার জন্য; এই “যুদ্ধ” যতটা না উপায় (বেঁচে থাকার) তারচেয়ে অনেক বেশি উদ্দেশ্য। ঠিক একই জিনিস অক্ষরে অক্ষরে ইসলামের জিহাদ ধারণার প্রতি প্রযোজ্য, আত্মরক্ষার জন্য সক্রিয় হওয়া নয় বরং শাশ্বত ঈশ্বরের প্রতি পালনীয় এক আবশ্যিক বিধান। ফ্যাসিবাদীরা বলবে, হয় তুমি আমাদের সমদর্শী হও নয় মরে যাও, আর ইসলামপন্থীরা বলে হয় তুমি ইসলাম মেনে নাও নয় মরে যাও। শেষের সেদিন আসবে, এই আদর্শ বিলীন হবে, নতুন পৃথিবী চোখ মেলে দেখবে তার শত্রুরা—মানবতায় অবিশ্বাসীরা, হয় মানবতার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেবে অথবা শেষ হয়ে যাবে।
এদের কিছু মিল তুলে ধরা যাক, ফ্যাসিবাদ এবং ইসলামপন্থা যেন “আগামী পৃথিবী”র অসুখবিশেষ, অবক্ষয় শুরু হলে সমাজ অতীতের গৌরবময় দিনগুলিকে স্মরণ করে। জার্মানি এবং ইতালি উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ছিল এক অসম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাঝে, আর ইসলামিক দেশ সমূহ ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। এরপর ইসলামিক সাম্রাজ্য ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে চলে যায়। উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামিক দেশসমূহ স্বাধীন দেশ ছিল না। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলিতে সীমা বিস্তারের আগে, ফ্যাসিবাদ প্রথম পা রাখে ইটালিতে। অন্য দেশ ছেড়ে কেন ইটালি? সেই সময়ে দেশটি ছিল এক অসম্পূর্ণ ঐক্যবন্ধন প্রক্রিয়ার মাঝে, রাজনৈতিক দলগুলি পারস্পরিক হানাহানিতে লিপ্ত, প্যারিস শান্তি চুক্তিতে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি তুঙ্গে, অর্থনীতি ভূলুন্ঠিত এবং বলশেভিক বিপ্লবের ভয় ধেয়ে আসছে। সর্বোপরি, ইটালি ছিল গভীর ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক, সেইসঙ্গে যথেষ্ট প্রভাবশালী চার্চের মূল দর্শন যার মধ্যে আছে বিভিন্ন নীতি যেমন সম্মান, যাজকতন্ত্র, ঐক্য, উজ্বল নেতৃত্ব এবং চরম সত্য—সেইসব উপাদান যারা টেনে নিয়ে যায় ফ্যাসিবাদের পথে।
ঊনবিংশ শতকে জাতীয়তাবাদের উথ্থানে, জাতীয়তাবাদী এবং ফ্যাসিবাদী আন্দোলন মাথা তুলল ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সের মতো দেশে যাদের একক রাষ্ট্রের অধীনে জাতীয়তাবাদী ঐক্যের দীর্ঘ ইতিহাস ছিল এবং সংসদীয় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার ইতিহাস যার দিকে তারা ফিরে তাকাতে পারে। কিন্তু জার্মানী এবং ইটালির চিত্র এর বিপরীত। ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ছিল প্রান্তিক আন্দোলন যা জনসাধারণকে ফ্যাসিবাদের উপর একত্রিত করতে এবং সঙ্ঘবদ্ধ করতে সক্ষম হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা সামান্যই প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছিল। ঐতিহাসিক আর্নস্ট নোলট (Ernst Nolte)-এর চোখে Action Francaise, ১৮৯৮ সালে ফ্রান্সে যে সহিংস ক্যাথলিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ছিল ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের অগ্রদূত যা পরবর্তীতে জেগে ওঠে ইটালী ও জার্মানীতে। এই আন্দোলনের আশা ছিল ক্যাথলিক চার্চের আধুনিকতাকে শেষ করে রক্ষণশীল খ্রীষ্টান সমাজ ফিরিয়ে আনা যাবে, কিন্তু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের জাতীয়তাবাদীরা সেখানে অধিক শক্তিশালী ছিল ফরাসি বিপ্লবের পর থেকেই আর নাৎসী সেনাবাহিনী ফ্রান্স দখল করলে তাদের যেটুকু প্রাসঙ্গিকতা ছিল তা চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।
১৯২৯ সালে ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ (শেয়ার বাজারে বিপুল ধ্বস) এর ধাক্কার তিন বছর পর অসওয়াল্ড মোসলে (Oswald Mosley) ব্রিটেন ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের হিসাব অনুযায়ী এই দল গর্বের সাথে ঘোষণা করে যে তাদের সদস্য সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার, মোসলে ইটালি সফর করলেন ফ্যাসিবাদ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য, পরে অ্যাডলফ হিটলারের SS বাহিনীর আদলে দলের জন্য কালো পোষাকের (Uniform) আদেশ দেন। নাইট অব দ্য লং নাইভস (Night of the long knives—হিটলারের উথ্থানের প্রক্কালে ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২ জুলাইয়ে নির্বিচারে প্রায় ১০০০ বিরোধী হত্যা) ঘটনার ফলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তার আন্দোলন জনসমর্থন হারায়।
পরবর্তীকালে জার্মানী এবং ইটালীতে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতা দখল করে, এর সমর্থকেরা ক্ষমতার রাশ হাতে নেয় এবং জণগনকে শত্রুকে দমন আর দুনিয়া শাসন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভ্রান্তপথে পরিচালিত করে। গুসেপ্পে মাজিনি (Giuseppe Mazzini) এবং গুসেপ্পে গ্যারিবল্ডি (Giuseppe Garibaldi) উনবিংশ শতাব্দীতে ইটালীতে যে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তার শেষ হয় ইটালিয়ান ফ্যাসিবাদে। ইটালিয়ান শব্দ fascio এসেছে ল্যাটিন fasces শব্দ থেকে যার অর্থ “গুচ্ছ”, রোমান সম্রাটদের সামনে একগুচ্ছ দণ্ড নিয়ে রাজকীয় দেহরক্ষীরা চলত, পরে তা বহন করত বেসামরিক কর্মী এবং অফিসাররা। এটা ছিল ক্ষমতার চিহ্ন এবং একই সাথে ঐক্যের চিহ্ন এবং বিরোধী বা অপরাধীদের দৈহিক শাস্তির জন্য উপযুক্ত অস্ত্রের প্রতীক। যখন মুসোলিনি (Mussolini) ১৯১৯ সালে তার প্রথম সংগঠন ফ্যাসি ডি কমব্যাটিমেন্টো (Fasci di Combattimento) স্থাপন করেন, তিনি বিশ্বশক্তি হিসাবে রোমান সাম্রাজ্যের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছিলেন—তিনি প্রকৃতই পুনর্গঠন করতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন।
জার্মান ফ্যাসিবাদও উঠে এসেছিল এক অবক্ষয়ের সময়ে। কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যায়, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, প্রতিষ্ঠিত দলগুলির দুর্বলতা, এবং ভার্সাই (Versailles) চুক্তি; ‘যাকে জার্মানীতে বলা হয় মিথ্যা বা অসম্ভব চুক্তি’, যেগুলি জাতীয়তাবাদী সমাজবাদের হাতে উর্বর জমি তুলে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল এই আন্দোলন উইলহেলমাইন (Wilhelmine)সাম্রাজ্যের স্বপ্ন “সূর্য্যের মাঝে একটু জায়গা” সত্যিই জার্মানীর জন্য এনে দিতে পারবে। ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স দুনিয়ার অধিকাংশ উপনিবেশ শাসন করার পর জার্মানী আবার জেগে উঠল এবং সেই সব শক্তিকে আঘাত করল যারা অল্পকাল আগে তাদের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিয়েছিল। এটি হচ্ছে সেই প্রচেষ্টা যাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্রবাহিনী নস্যাৎ করে দিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অপমানজনক পরাজয়ের স্মৃতি ভুলে অক্ষমতা এবং সর্বক্ষমতার স্বপ্নের অদ্ভুত মিশ্রণ নাৎসী (Nazi) শক্তির উথ্থানের নিখুঁত পরিবেশ সৃষ্টি করল।
ইসলামপন্থীরাও ঠিক সেই একই অক্ষমতা এবং সর্বক্ষমতার মিশ্রণে তাদের বিশ্বাস প্রদর্শন করে। আর এটিই হচ্ছে অত্যাচারিতের অনুভূতিকে ব্যবহার করে তাঁকে অনেক বেশি শক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করার স্বপ্নে বিভোর করে জাতিকে তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করানোর কৌশল। অধিকাংশ ইসলামিক দেশ সমূহকেই পশ্চাৎপদ দেশ বলা যায়, ঠিক যেমনটা ছিল বিগত শতাব্দীতে জার্মানি এবং ইতালি। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে (এবং ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়ার পর থেকে ইসলামিক দেশ সমূহ আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পুরনো আমলের রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে কোনটাকে গ্রহণ করতে পারেনি। আর তাই অধিকাংশ ইসলামি দেশ পিছিয়ে থাকে কয়েক দশক। ইসলামি দেশে শাসন ব্যবস্থায় চলতে থাকে এক ধরনের মিশ্র ও পরস্পর-বিরোধী আইন কানুন। আর এভাবেই তা হয়ে যায় এক ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্র দেশ, কিংবা আধুনিকতার চর্চা করা থেকে ভয় পাওয়া এক অদ্ভুত দেশ। এই দেশসমূহে ইসলামপন্থীরা সবসময় চেষ্টা করতে থাকে শাসনব্যবস্থার দখল নেয়ার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামপন্থীদের বিকল্প হিসেবে সামরিক বাহিনী ছাড়া আর কেউ থাকেনা, একইসাথে যে কোন একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবেও ইসলামপন্থীরা ছাড়া আর কেউ থাকেনা। খ্রীষ্টধর্মের মাত্র ছয় শতাব্দী পরে পৃথিবীতে এসে ইসলাম, যাকে বলা যায় বিলম্বিত ধর্ম, আজও তার মধ্যবয়সে পড়ে আছে: ইসলামি সময়কালকে ধরলে প্রকৃতপক্ষে ১৪৩৬ সাল মিলে যায় ২০১৫ সালের সাথে। বেশীরভাগ মুসলিম দেশ, যেখানে ইসলাম দেরীতে এসেছে, ঠিক যেন ১৯২০ সালের জার্মানী বা ইটালি। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর (পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষে) এই দেশগুলি দ্বিধায় পড়ল যে তারা আধুনিক রাষ্ট্র হবে না কি প্রাচীন উপজাতীয় কাঠামো এবং মোল্লাতন্ত্রে থাকবে। ফলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি আগের শাসনব্যবস্থাগুলির বিপরীতমুখী মিশ্রণে দশকের পর দশক ধরে একই পরিস্থিতিতে স্থির হয়ে রইল। একনায়কতান্ত্রিক (সামরিক) দেশগুলি বা যারা সন্তর্পণে সাহস করে আধুনিকতার কাছাকাছি পৌঁছল, সেখানে ইসলামপন্থীরা একটি রাজনৈতিক বিকল্প সৃষ্টি করতে পারল।
বলশেভিকবাদ এবং ফ্যাসিবাদের পর বিংশ শতাব্দী দেখল আধুনিকতা এবং সভ্যতার মূল্যবোধের উপর ভয়ানক আক্রমণ: ঐতিহাসিক আর্নস্ট নোলট (Ernst Nolte) এবং দার্শনিক আরনেস্ট গেলনার (Ernest Gellner) উভয়েই ইসলামবাদকে দেখেছেন আধুনিকতাবিরোধী তৃতীয় শক্তি হিসাবে। তিনটিই অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তিগত আবিস্কারের সুবিধা নিয়েছে, তবুও তারা সভ্যতার ভিত্তিমূলে ভয়ঙ্কর আঘাত করেছে। যুক্তি, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, মানবাধিকার, শরীরের অধিকার, সেই সাথে বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা—তিনটিই এগুলিকে বিপদ হিসাবে দেখে।
বিশেষত, এই তিনটি আন্দোলনই সর্বদা অনুভব করেছে যে গ্রামীণ থেকে নাগরিক সমাজে পরিবর্তন সমাজকে অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যে সমাজ অতীত প্রেক্ষাপট এবং/অথবা আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। এটাই একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি। গ্রামীণ পরিবেশের রহস্যময় আনন্দ প্রায়শই এইরকম সমাজকে রক্ষা করতে চেষ্টা করার মূল কারণ এবং নাগরিক জীবন বিরোধী আলোচনা তিনটি আন্দোলনকে পৃথক করে দেখায়। বলশেভিকদের কাছে, নগর হল সর্বহারাদের শোষণের জায়গা; নাৎসীদের কাছে, গৌরবময় কুড়ির দশকের ঐতিহ্যময় নৈতিকতার পতনের প্রতীক বার্লিন শহর; এবং ইসলামপন্থীরাও মনে করে নগর হল পাপ এবং নৈতিক অবনমনের জায়গা।
সমগ্র ইতিহাসে যেখানেই ফ্যাসিবাদী, কমিউনিস্ট এবং ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে; সমাজ সেখানে পরিণত হয়েছে খোলা কারাগারে, যার বাসিন্দা—তাদের নিজেরই নাগরিক—চব্বিশ ঘন্টা যাদের উপর নজরদারী রাখা হয়। বহুত্ববাদকে চিরকালই এবং এখনও দেখা হয় বিপদ হিসেবে, অথচ হিংসা এবং ভীতির মাধ্যমে সামাজিক ঐকমত্য কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় নাগরিকদের উপর। তারা বিশ্বাস করে তাদের মতই(opinion) এক এবং একমাত্র সত্য আদর্শ, বিরোধীদের ভাগ্য ভাল থাকলে দাগিয়ে দেওয়া হয় স্বধর্মত্যাগী বা বিশ্বাসঘাতক বলে, অন্যথায় সরাসরি হত্যা।
যেখানেই ইসলামিক ফ্যাসিবাদ শাসনক্ষমতা লাভ করে, ঠিক যেমনটি ঘটেছে ইরান, সুদান, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া গাজা এবং আইসিসের দখলকৃত অঞ্চলে সেখানেই শুরু হয় বর্বর একনায়কতন্ত্র। ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাবে এই অজুহাতে তারা বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করে। যেখানেই ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে সেখানেই তারা এবং তাদের সহযোগীরা চেষ্টা করে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটানোর। তাঁরা নিজের দেশে কঠোর সব আইন প্রণয়ন করে যেমনটি এখন আছে আলজেরিয়া, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায়। আর এটিই হচ্ছে মিশর এবং সিরিয়ারও অনিবার্য পরিণতি। এসকল কিছু ছাড়াও রাজনৈতিক ইসলাম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে, এর অনেকগুলো কারণও আছে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নস্যাৎ করা এবং জনগণের হীনমন্যতা ইসলামিক দেশসমূহে কেবলমাত্র ইসলামপন্থীদেরকেই বিকল্প হিসেবে রাখে যে ইসলামপন্থীরা জাতিকে সাময়িকভাবে হলেও কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিতে পারে।
আভ্যন্তরীণ সমালোচনার শ্বাসরোধ করতে একনায়কতন্ত্র আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে উসকে দেয় ভীতি, দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে কোন প্রকৃত অথবা কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। নাৎসীরা এই কাজটিই করে একটু সৃষ্টিশীলতার সাথে, জার্মানীর লোকদের প্রথমে ভয় দেখানো হয়েছিল তাদেরই দেশের ইহুদী এবং কমিউনিস্টদের দেখিয়ে, পরে বহিঃশত্রু সম্মিলিত বাহিনীকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে বারবার বহিঃশত্রুর বদল ঘটেছে; প্রথমে নাৎসীরা এবং পরে গণতান্ত্রিক পাশ্চাত্য। কমিউনিস্টদের মধ্যে বিরোধীরা ছিল আভ্যন্তরীণ শত্রু, ধরে নেওয়া হত তারা পাশ্চাত্যের সহযোগীতায় সামাজিক ঐক্যের ক্ষতিসাধন করবে।
অপরপক্ষে, ইসলামপন্থীরা সর্বদাই বলে এসেছে একই তিন শত্রুর কথা। পৃথিবীর অপর প্রান্তে পাশ্চাত্য, বাড়ীর কাছে ইজরায়েল; এবং প্রচলিত ধর্মের বিরোধীরা, সংশোধনবাদীরা, ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তকরা ও রাজনীতিবিদরা আভ্যন্তরীণ শত্রু, এরা চিরায়তভাবে পাশ্চাত্যের পরিবর্ধিত রূপ। যেখানেই ইসলামি ফ্যাসিবাদ ক্ষমতা দখল করেছে; যেমন ইরাণ, সুদান, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া এবং গাজা; সব জায়গাতেই নিষ্ঠুর একনায়কতন্ত্র জেগে উঠেছে, আজ পর্যন্ত তারা ক্ষমতা ছাড়তে রাজী নয়। যেখানেই ইসলামপন্থীরা সরকার থেকে উৎখাৎ হয়েছে, তারা এবং তাদের সমর্থকরা সন্ত্রাসবাদীতে পরিণত হয়েছে, বিধ্বংসী হিংস্র আক্রমণ করেছে নিজের দেশের জনগণের উপরেই, যেমন আলজিরিয়া, আফগানিস্তান, মালি, এবং লিবিয়া—একই পরিস্থিতি এখন দেখা যাচ্ছে মিশর এবং সিরিয়াতে।
তবুও যেহেতু মুসলিম দেশগুলির জণগনের উপরে একটা বিস্তৃত আবরণ আছে, সে কারণে রাজনৈতিক ইসলাম একটা আশার আলো। অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি হল এইসব দেশে জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতারা কেউই তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করতে রাজী নয়—বিশেষত, আজ পর্যন্ত পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের কোন বিকল্প সৃষ্টিতে তাদের অক্ষমতা। সর্বোপরি, আহত অহংকার আরব দুনিয়ার ইতিহাসের সমস্ত পুনর্মূল্যায়নকে এবং পাশ্চাত্যের সাথে ফলদায়ী সম্পর্ককে পঙ্গু করে দিয়েছে। সেই সাথে বহু আরব দেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে তারা পাশ্চাত্যের দ্বারা প্রতারিত, ফলে সম্মিলিতভাবে পাশ্চাত্য-বিরোধী ঘৃণার সৃষ্টি হয়। ধর্মনিরপেক্ষ একনায়কতন্ত্র এবং তাদের ইসলামি প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়েই এই ঘৃণায় পরিপূর্ণ; ফলে উদ্ভব হয় এক দিশাহারা, হতাশ এবং বিশেষভাবে ক্রোধোন্মত্ত এক প্রজন্মের। কিছু অংশ তাদের ক্রোধ প্রকাশের উপায় হিসাবে বিদ্রোহ করে অভিজাত শাসকের বিরুদ্ধে, অন্যেরা আশ্রয় এবং সান্ত্বনা খোঁজে ইসলামের মধ্যে।
এভাবেই আরব বসন্তের পশ্চাৎপটে যে একদা-শান্তিপূর্ণ গণ আন্দোলন ছিল তা বিলীন হয়ে যায় দুই গোষ্ঠীর নিরন্তর অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে। যে বিবাদকে আমি বলতে চাই সভ্যতার আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—অতি আলোচিত পাশ্চাত্যের সাথে ইসলামি বিশ্বের লড়াই নয়। বরং এক আরব-আভ্যন্তরীণ, ইসলামি-আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ইসলামি বিশ্বকে দেখা যেতে পারে পিঁয়াজের মতো বহুস্তরীয় একনায়কতন্ত্র হিসাবে: রাজবংশের একনায়কতন্ত্র যেমন, মুবারক, গদ্দাফি, হুসেইন, বেন আলি, এবং আসাদ পরিবার এর প্রথম স্তর; দ্বিতীয় স্তর সামরিক একনায়কতন্ত্র; তার পর ধর্মীয় একনায়কতন্ত্র যা স্থির করে দেয় কিভাবে শিশুদের বড় করা হবে বা শিক্ষা দেওয়া হবে; এবং সবশেষে সমাজের একনায়কতন্ত্র যা প্রাচীন লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার মাধ্যমে পরিবারের আভ্যন্তরীন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
পিঁয়াজের প্রতিটি স্তরের মতোই ইসলাম বিশাল উঁচু দেওয়ালের মতো ইসলামি বিশ্বকে বাকী পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, যেন তার আত্মপরিচিতিকে সুরক্ষিত করছে। আরব বসন্তের সময় যে যুবকরা পথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করত তারা একটা স্তরকে ছাড়িয়ে ফেলতে পেরেছে, মুখোমুখী হয়েছে পরবর্তী স্তরের। শেষপর্যন্ত এটা হতে পারে যে পিঁয়াজের কেন্দ্র—ধর্ম—টুকুই শুধু রয়ে গেল। এটা এখনও তর্কসাপেক্ষ যে, যদি তাই হয়, যুবশক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রকে অপসারিত করতে পারবে কি না। তারা যদি সফল হয়, তারা দেখবে যে পিঁয়াজটি আসলে ছিল একটি ভয়ের বস্তু—তার অনেক স্তরের মধ্যে কখনই এমন কিছু ছিল না যা রক্ষা করার যোগ্য। একমাত্র তখনই আমরা “বিপ্লব”-এর কথা বলতে পারি—ততদিন পর্যন্ত ইসলামের প্রাচীন একনায়কতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য তার পদচিহ্ন রাখতেই থাকবে, এমন অঞ্চলেও বিস্তৃত হবে যেখানে আগে ধর্মের ভূমিকা ছিল নগণ্য।