Mufti Masud

মাদ্রাসার বদ্ধ কারাগারে আমাদের শেখানো হয়নি – দেশের সম্পদ লুটেরাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে, মানুষের উপর অত্যাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে; আমাদের শেখানো হয়নি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সে কথাও। আর তাই আমি এবং আমার সহকর্মী তথা ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষক সম্প্রদায়ের কেউ কোনদিন খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ঘুষ সহ বাংলাদেশের সমাজে প্রতিদিন ঘটমান অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারিনি। লুটপাট, খুন, ধর্ষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাঁরা কেউই ধর্মপ্রাণ মুসলমান না। তাঁরা অধিকাংশই বামপন্থী। শুধুমাত্র শুক্রবার মসজিদে দেয়া ভাষণে আমরা সামান্য কথা বলতে পারতাম, কিন্তু সে কথা জীবে দয়ার কথা নয়; সে কথা ছিল কেবল ঘৃণা ও জিঘাংসায় ভরপুর। সরকারের অন্যায়ের সমালোচনা করতে পারতাম না, কিন্তু অমুসলিমদের বিরুদ্ধে, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে হিংসার কথা বলতে পারতাম; কারণ এটি ইসলামের শিক্ষা এবং আমাদের ঈশ্বরদের (রাজনীতিবিদদের) চাহিদা। এটি সরকারি দল এবং বিরোধী দল সবার চাহিদা। আমি এবং আমার মতো যারা তুলনামূলক মানবিক বোধসম্পন্ন ছিলাম, তাদের পৃথিবীটা খুবই সংকীর্ণ। মানবপ্রেমের কথা বলা নিষিদ্ধ, কারণ ইসলামে মানবপ্রেম নিষিদ্ধ। ইসলাম শুধু মুসলিমদের ভালোবাসতে বলে, অমুসলিমদের ঘৃণা করতে নির্দেশ দেয়। প্রমাণ চাইলে দেখুন কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ :
আমাদের সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বরদের কাছে আমরা (মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার হুজুররা) বড় আদরণীয় বস্তু। তাদের পুকুর চুরি, সাগর চুরি, ব্যাংক ডাকাতি ও খুন-সন্ত্রাসের প্রতিবাদ আমরা করতাম না; করতে পারতাম না। বরং তাদের সামনে পেখম মেলে প্রেমের খেমটা নাচ দেখাতে বাধ্য আমরা। তাদের বাপ-দাদা, মা, বোন, ভাই সহ চৌদ্দগুষ্টিকে বেহেশতে পাঠানোর ঠিকাদারি করতে হয় আমাদের। তাদের পুকুর চুরি, সাগর চুরি, ব্যাংক ডাকাতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের পাপমোচন করতে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও ফরিয়াদ করতে আমরা বাধ্য। আমাদেরকে মাদ্রাসার কারাগারে ঢুকিয়ে কোরআনের বিদ্যা দিয়ে এজন্যই তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের ন্যায়, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও জীবে দয়া শেখানো হয়নি। দুনিয়ার কোথাও মানুষের উপর অত্যাচার হলে আমরা তা নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। আমরা মাথা ঘামাতাম দুনিয়ার কোথায় মুসলিমরা অত্যাচারিত হচ্ছে তাই নিয়ে। সৌদি আরব, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, মিশর, বাংলাদেশ সহ মুসলিম দেশগুলোতে যে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের দুঃখ পাবার শিক্ষা দেয়া হয়নি। আর তাই, আমরা শুক্রবারের মোনাজাতে (প্রার্থনায়) পাকিস্তানের খ্রিস্টান, সৌদি আরবের সংখ্যালঘু শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী যারা মুসলিমদের দ্বারা নিপীড়িত তাদের জন্য প্রার্থনা করতে পারতাম না। কিন্তু আমরা মোনাজাত করতে পারতাম বা করতে বাধ্য হতাম প্যালেস্টাইন, মিয়ানমার, ভারত ও চেচনিয়ার মুসলমানদের জন্য। কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোন অমুসলিমের জন্য প্রার্থনা করার বৈধতা আল্লাহ মুসলিমদের দেননি। এমনকি কোন মুসলিমের আত্মীয় যদি অমুসলিম হয় তবুও তার জীবদ্দশায় তো নয়ই, মৃত্যুর পরেও তার জন্য প্রার্থনা করা যাবে না – প্রমাণ :
০৯/১১৩ সূরা আত তাওবা,
নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের (জাহান্নামের) অধিবাসী।
সুতরাং চরম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক প্রার্থনা সহ দৈনন্দিন জীবনযাপনে যে অমানবিক বক্তব্য দিতে ও অমানবিক ধ্যানধারণার প্রসার করতে আমরা যা যা করতাম তা আমাদের অনুসৃত রাজনৈতিক গ্রন্থ আল কোরআনেরই শিক্ষা। এই শিক্ষার বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ নেই, কোনকালে ছিল না, এবং অদূর ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না।
